,

কাছে, তবু দূরে হায় !

প্রিয় কবি সমর সেন কে দিয়ে শুরু করি, তিনি তাঁর একটি কবিতায় লিখেছেন,
আর , আমাকে ছেড়ে তুমি কোথায় যাবে?
তুমি যেখানেই যাও
আকাশের মহশূন্য হতে জুপিটারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি
লেডার শুভ্র বুকে পড়বে ।
আসলে কবির প্রতি ভালোবাসা থেকেই কবিতার জন্য ভালোবাসা । সমর সেন অনেকেরই প্রিয় কবি। একটা সময় রীতিমতো ঘোষনা দিয়ে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। কবিতা লেখা ছেড়েছেন এমন একটা সময়ে,যখন তিনি জনপ্রিয়তার একদম তুঙ্গে । এমন উদাহরণ খুব একটা দেখা যায় না। সমর সেনের কবিতার যে দিকটি ভালো লাগে, সেটি মূলত তাঁর সমাজ সচেতনতা। সমাজসচেতনতা কবি সুকান্ত বা অন্য কবিদের কবিতায়ও আছে । কিন্তু সমর সেনের কবিতায় মুগ্ধ করার মতো ব্যাপার হচ্ছে , সমাজসচেতনতার সঙ্গে সঙ্গে তিনি মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ,প্রেম-ভালোবাসা -এসব বিষয়ও মাথায় রেখেছেন।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কে একটু হাজির করি। তাঁর রামান্টিকতা বংলা সাহিত্যর বেশ বড় জায়গা দখল করে আছে। প্রেম ও অপ্রেম ,প্রবল বেদনা ও শিখর স্পর্শী আনন্দ , প্রলয়-প্লাবল মহামারী আর সৃষ্টি-“মলয়-অনিল” নিশাবসান- এর মতো প্রবল বিপরীতমুখী প্রসঙ্গে-অনুষঙ্গে নজরুলের বিদ্রোহী প্রতিমা অবয়ব পেয়েছে। গড়নের ওই বৈপরীত্যে যাকে বলা যায় তুমুল বিরোধাভাস, কদম ফুলের শতমুখ সুক্ষ্ণ পাপড়ির মতো উন্মুখ যে রোমান্টিকতা , তারই সবচেয়ে সাধারণ অথচ অনন্য সাধারণ লক্ষণ। কবি তাঁর একটি কবিতায় লিখেছেন-
এসো বন্ধু , মুখামুখি বসি !
অথবা টানিয়া লহ তরঙ্গের আলিঙ্গন দিয়া , দুঁহু পশি
ঢেউ নাই যেথা-শুধু নিতল সুনীল !
সেইখানে ক’ব কথা। যেন রবি-শশী
নাহি পশে সেথা ।

বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও সাহিত্য সমালোচক শঙ্খ ঘোষ ( তিনি একজন বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও । তাঁর প্রকৃত নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। যাদবপুর, দিল্লি ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপনাও করেছেন) তাঁর জার্নালে লিখেছেন : দিল্লী থেকে এসেছিল এক গল্প লেখক , তার ” ইন্ডিয়া সিম্ফনি এন্ড অ্যাদার স্টোরিজ ” সঙ্গে নিয়ে। পথে ঘুরতে ঘুরতে , ফ্রেস্কো দেখতে দেখতে, গাছের নিচে ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার পাশ দিয়ে চলতে চলতে প্রশ্ন করেছিলেন হঠাৎ- Don’t you think that love is a dead thing ? A thing of the past ?  উত্তরে একটা জোরালো রকমের “না” শুনে অট্টহাস্যে পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, oh you are incorrigible romantic !  এ রকম ধারণা তো অনেকেরই, একটা ফ্যাশনও বলা যায়। আজকাল আধুনিক হওয়ার জন্য এসব কথা অনেকের মুখে শুনি। কিন্তু আধুনিকতা কি অপ্রেম , অস্বস্তি আর অমঙ্গল ? ভালোবাসা কি আধুনিকতা নয় ? কেন নয় ? ভালোবাসাই পুণর্তা এনে দেয়। এখনো মাতৃস্নেহ, সন্তানের প্রতি পিতার অপার মমতা, বন্ধুর জন্য বন্ধুর সহমর্মিতা শেষ হয়ে যায়নি । যাওয়ারও নয় কখনো। পৃথিবী এভাবেই চির নতুন হয়ে ওঠে। আমরা চিরনতুনের পক্ষে।
কাছে থাকো, তবু পাশে আসতে ভয় কেন। ভয় নেই আমি আছি নির্ভীক আগামীর যুদ্ধে । চলে এসো , যদি মন কাদেঁ । প্রিয় কবি শহীদ কাদরী ‘তোমাকে অভিবাদন,প্রিয়তমা’ কবিতায় এরকম প্রিয়তমা কে অভয় দিয়েছিলেন-
ভয় নেই, ভয় নেই
ভয় নেই
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
নৌ, বিমান আর পদাতিক বাহিনী
কেবল তোমাকেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে ঘিরে
নিশিদিন অভিবাদন করবে, প্রিয়তমা ।
তবু কাছে, দুরে নয়। আরো অনেক কাছে , দুরে নয়। সত্যি কাছে, দুরে নয়।।

বদরুল আলম
লেখক: প্রভাষক, তাজপুর ডিগ্রী কলেজ, সিলেট।
এমফিল গবেষক , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।

     এ জাতীয় আরো খবর