,

চালকের বেপরোয়া মানসিকতা কেড়ে নিলো জকিগঞ্জ পৌরসভার মনিরুজ্জামানকে

আল মামুন, জকিগঞ্জ::
পৌরসভার কোনো অনুষ্ঠান হলে, মেয়র বা কাউন্সিলরদের কোনো কাজের সংবাদ থাকলে কিংবা পৌর কর্মকর্তা কর্মচারীদের দাবী দাওয়ার কোনো কর্মসূচি পালিত হলে মনির ভাইর ফোন পেতাম। ‘ভাই আপনার ই-মেইলে বা ইনবক্সে একটা সংবাদ পাঠাইছি, একটু দেইখেইন’ । নরম সুরে বলতেন তা প্রকাশ করার জন্য। তিনি ভুলেও জানতেন না যে তিনিই এত তাড়াতাড়ি সংবাদ হয়ে যাবেন। দুর্ঘটনার আধা ঘন্টা আগেও ফোন করে একাধিক সেবা গ্রহিতাকে বলেছেন পৌরসভায় আসুন আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই আসতেছি। সেই আসা আর হলো না জকিগঞ্জ পৌরসভার প্রধান সহকারী মনিরুজ্জামানের। চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছেন সবার প্রিয় মনির ভাই। যেখান থেকে কেউ কোনো দিনে ফিরে আসে না। ২০০৬ থেকে ২০১৮ মাত্র বারো বছরে হবিগঞ্জের মনির হয়ে উঠেছিলেন জকিগঞ্জের মনির। হাসিখুশী কর্মঠ মনিরুজ্জামান কাজ করেছেন জকিগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান ও মেয়র ইকবাল আহমদ, প্রয়াত মেয়র আনোয়ার হোসেন সুনা উল্লা, সাবেক মেয়র ফারুক আহমদ, বর্তমান মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী খলিল উদ্দিনের সাথে কাজ করেছেন মনির। জকিগঞ্জ পৌরসভার বরাদ্ধ প্রাপ্তির জন্য ঢাকায় দৌঁড়ঝাপ করেছেন বহুবার। কোনো বরাদ্ধ না পেলে কিংবা ফেরত গেলে তার মনের কষ্টটা ভাগাভাগি করতেন ঘনিষ্টজনদের সাথে। আপনজন ছিল তার সবাই। জকিগঞ্জবাসীর ফেসবুকই তার প্রমাণ। সবার ফেসবুক যেন শোক বইয়ে পরিণত হয়েছে। মানুষকে আপন করে নেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল মনিরুজ্জামানের। মিশুক স্বভাবের সামাজিক মানুষ ছিলেন মনির। সবার সাথে মিলে মিশে কাজ করার একটা মানসিকতা ছিল তার। জকিগঞ্জ পৌরসভাকে নিয়ে মনির স্বপ্ন দেখতেন পৌরবাসীর মতোই। সর্বশেষ প্রায় এক কোটি টাকার একটা বরাদ্ধ আসছে শুনে যার পর নাই খুশী হয়েছিলেন তিনি। জকিগঞ্জ পৌরসভার কিচেন মার্কেট, নিজস্ব ভবন সবই হয়তো হবে একদিন কিন্তু তার আর কখনো দেখতে পারবেন না। মনিরুজ্জামানের গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার পৈলাকান্দি ইউনিয়নের নজরপুর গ্রামে। তার বড় মেয়ে সিলেট জালালাবাদ ক্যান্টেমেন্ট স্কুল থেকে আঁখি এবার এসএসসি এবং ছোট মেয়ে লাকী এবার প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার্থী। একমাত্র ছেলে তাহসিন সিলেট শহীদ ক্যাডেট স্কুলে প্লে গ্রুপে লেখাপড়া করছে। সপরিবারে তিনি জকিগঞ্জেই ছিলেন। ছেলে মেয়ের পড়াশুনার সুবিধার জন্য তিন বছর আগে সিলেট শহরে বাসা ভাড়া নিয়েছেন। ফেসবুকে সরব ছিলেন মনিরুজ্জামান। সর্বশেষ দুই নভেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে ছেলের সাথে উঠানো একটি পোস্ট করেছিলেন। তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলের নিচে লিখা আছে ‘ আই লাভ মাই ফ্যামেলী মোর দেন মাই লাইফ’। সেই মায়ার অবুঝ সন্তান, স্ত্রী, মা-বাবা, ভাই-বোন সবাইকে ফেলে তিনি চলে গেছেন দূরে অনেক দূরে। পরিবারেব চেয়েও তার কাছে আপন ছিল জকিগঞ্জ পৌরসভা। পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর, পৌরবাসী। যাদের সাথে কাজ করেছেন দীর্ঘ প্রায় এক যুগ। মনিরুজ্জামানের বড় ভাই কৃষি কাজে সম্পৃক্ত। ছোট দুই ভাই ওমান ও মালয়েশিয়া প্রবাসী, সবার ছোট ভাই সম্প্রতি মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। দুই বোন বিবাহিত। বানিয়াচংয়ের দুর্গাপুর গ্রামের জাকিয়া জামানের সাথে ১৯৯৮ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। জকিগঞ্জের আগে প্রায় ৫ বছর তিনি কমলগঞ্জ পৌরসভায় চাকরি করেন। মনিরুজ্জামান তার সহকর্মী পৌরসভার প্রকৌশলী আব্দুল খালিককে সাথে নিয়ে জিরো পয়েন্ট থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকসায় রোববার জকিগঞ্জ আসছিলেন। পাঁচপীরের মোকামের পাশে সড়কে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি ট্রলিরকে ধাক্কা দেয় সিএনজি। এতেই দুর্ঘটনায় কবলিত হন মনিরসহ অন্যরা। জানা গেছে সিএনজির চালক জসিম উদ্দিন বেপরোয়া গতিতে সব সময় গাড়ি চালাতেন। তিনিও এ দুর্ঘটনায় মারাতœক আহত হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। অবৈধ ট্রলি আর অদক্ষ বেপরোয়া চালক, লাইসেন্সবিহীন গাড়ি আর কত মনিরকে কেড়ে নেবে কে জানে। কে থামাবে সড়কের এ মৃত্যুর মিছিল? ওপারে সুখে থেকো মনির ভাই। এইটুকু বলা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। ক্ষমা করো আমাদেরকে।

     এ জাতীয় আরো খবর