,

জকিগঞ্জে উপবৃত্তির টাকা পেতে ভোগান্তি

স্টাফ রাইটার::
রূপালী ব্যাংক শিওর ক্যাশ অ্যাকাউন্ট থেকে সময়মতো টাকা উত্তোলন করতে না পারা, টাকা কম পাওয়া এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে কমিশন রাখা, দুর্বল নেটওয়ার্কের দোহাই দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে টাকা না দেয়াসহ নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জকিগঞ্জ উপজেলার প্রকল্পভুক্ত ১২৫টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ হাজার অভিভাবক। মোবাইলে ম্যাসেজে পুরো টাকা না আসা, নেটওয়ার্ক ও সার্ভার সমস্যা দেখিয়ে এজেন্টরা গ্রাহকদের টাকা দিতে না পারা- এসব কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামীন, বাংলালিংক, রবি ও টেলিটকসহ বিভিন্ন অপারেটর গ্রাহকরা। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তির ৩ মাসের টাকা সরকার শিক্ষার্থী গ্রাহকদের নিজ নিজ অ্যাকাউন্টে দিলেও রূপালী ব্যাংক শিওর ক্যাশের দায়িত্বরত সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে সময়মতো টাকা তুলতে পারছেন না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী গ্রাহকদের। অপরদিকে এজেন্টরা সার্ভিস চার্জের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে ১০ টাকা থেকে ৩০টাকা পর্যন্ত করে চার্জ বেশি নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি মাসে ৫০ টাকা ও প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি মাসে ১শ’ টাকা করে শিক্ষার্থীদের ‘প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি’ প্রদান করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা টাকা তুলতে এজেন্টদের কাছে গেলে নেটওয়ার্ক কিংবা সার্ভার সমস্যা দেখিয়ে ফেরত পাঠাচ্ছেন। তাছাড়া কারও মোবাইলে ছয় মাসের পুরো টাকা এলেও কেউ কেউ তিন মাসের টাকা পাচ্ছেন। ফলে দফায় দফায় এজেন্ট দোকানে গিয়েও সময়মতো গ্রাহকরা কাঙ্খিত টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।

জকিগঞ্জ উপজেলার গোলকচান্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুর রহমান সোমবার উপজেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাসিক সমন্বয় সভায় জানান, তার বিদ্যালয়ে তিন সন্তান বিশিষ্ট একই পরিবারের একজন সুবিধাভোগী মহিলা অভিভাবকের মোবাইল ব্যালেন্সে ২ বারে ৬০০ ও ১০৫০ টাকা করে মোট ১৬৫০ জমা হয়। জকিগঞ্জ বাজারে একজন এজেন্টের কাছে তিনি টাকা উত্তোলন করেতে গেলে ঐ এজেন্ট তার হাতে ৬০০টাকা দিলে তিনি সরল বিশ্বাসে বাড়ি চলে যান। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী গত বৃহস্পতিবারে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে মোবাইলটি নিয়ে যান এবং টাকা কম পাওয়ার কথা বলেন। প্রধান শিক্ষক মোবাইলের মিনি স্টেটমেন্ট পড়ে ঐ এজেন্টকে চ্যালেঞ্জ করলে প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে। ঐ এজেন্ট ভুল স্বীকার করে বাকী টাকা ফেরত দেন। একই বিদ্যালয়ে আরো দুটি প্রতারণার বিষয়ে তিনি উপস্থিত সবাইকে আবগত করেন। এ সময় সভায় উপস্থিত অনেক প্রধান তাদের বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও এমন ভোগান্তি ও প্রতারণার কথা জানান।
পশ্চিম জামডহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর আলম বলেন, প্রতি কিস্তিতে একটি বিদ্যালয়ের মোট কতজন শিক্ষার্থী, মোট কত টাকা পাবেন তা বিদ্যালয়ের তালিকায়(ডিজবার্সমেন্ট শিট) উল্লেখ থাকে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বিপরীতে অভিভাবক কত টাকা পাবেন তা মোবাইল ম্যাসেজের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে না পারলে টাকা উত্তোলনের আগে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ করলে সহজেই জানতে পারবেন এবং ভোগান্তি থেকে রক্ষা পাবেন। তিনি জানান, সার্ভারের ত্রুটি বা অন্য কারণে কোনো অভিভাবক মোবাইলে ম্যাসেজ না পেলে উপজেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে বাদ পড়াদের তালিকা সিওরক্যাশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠালে ফেরত ম্যাসেজের মাধ্যমে সে টাকা পাবার ব্যবস্থা রয়েছে।
উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল আহমদ বলেন, এজেন্টদের দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে । প্রয়োজনে এজেন্ট, অভিভাবক, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বৈঠকের উদ্যোগ নেয়া হবে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিজ মিয়া বলেন, সহজলভ্যতা ও স্বচ্ছতার জন্যই অনলাইনে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছে সরকার। শিওরক্যাশ কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা তালিকা হস্তান্তর করেছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমাদের তাদের এজেন্টদের তালিকা দেয়নি। কোনো পর্যায়ে কারো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে খতিয়ে দেখা হবে।
শিওরক্যাশের টেরিটরি ম্যানেজার এসএম শামীম জানান, উপবৃত্তি প্রদানের নিয়মাবলী সম্বলিত ‘ট্রেড লেটার’ প্রাপ্ত প্রায় শতাধিক এজেন্ট রয়েছেন জকিগঞ্জে। এজেন্টদের হাজারে ৬টাকা ২৬ পয়সা হারে কমিশন দেয়া হয়। অভিভাবকদের সচেতনতার জন্য প্রত্যেক এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে। অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযুক্ত এজেন্টদের প্রতিও সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জকিগঞ্জ বাজারের একজন শিওর ক্যাশ এজেন্ট জানান, সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলার দুর্বল নেটওয়ার্কের বিষয়টি সবারই জানা রয়েছে। যেহেতু মোবাইলের ম্যাসেজে গ্রাহকের সকল তথ্য সংরক্ষিত থাকে তাই এখানে প্রতারণার বিষয়টি অবান্তর। শিওরক্যাশ সর্বশেষ কিস্তিতে টাকা প্রদানের সময় কাউকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে পরবর্তীতে যাচাইপূর্বক সংশোধন করে কম টাকা প্রদান প্রদান করেছে। এক্ষেত্রে বেশীরভাগ উপবৃত্তি প্রাপ্তরা উভয় ম্যাসেজেরই টাকা দাবী করছে। এক্ষেত্রে দুটি ম্যাসেজ আসার কারণে বিভ্রান্তি তৈরী হয়েছে। কখনো গ্রাহক ম্যাসেজ না পেলেও প্রাপ্য টাকার চেয়েও অতিরিক্ত টাকা একাউন্টে জমা হয়েছে। ঐ এজেন্ট জানান, কমিশনের তুলনায় গ্রাহকের চাপ বেশী হওয়ার কারণে কোন কোন এজেন্ট সেবা দিতে অনিহা প্রকাশ করতে পারেন। একজন এজেন্ট সেবা দিতে গেলে তাকে নিজস্ব পুজি বিনিয়োগ করতে হয়। যা সবার পক্ষে সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে। জকিগঞ্জে গ্রামীন ফোনের গ্রাহকই বেশী। গ্রামীন ফোনে শিওরক্যাশে বিকাশ ও রকেটেরমত ব্যালেন্স দেখার ব্যবস্থা না থাকায়ও বিভ্রান্তি হচ্ছে। ফলে এজেন্টদের অযথা দোষারোপ করা হচ্ছে।

‘নেই কোন বিদেশী গ্র্যান্ড উপবৃত্তি শেখ হাসিনা ব্র্যান্ড” এই শ্লোগানকে সামনে রেখে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাঝে উপবৃত্তি প্রদান করছে সরকার। ২০১৬ সালের জুনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রূপালী ব্যাংকের মধ্যে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী শিওরক্যাশ মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে সুবিধাভোগী মা-বাবার মোবাইল অ্যাকাউন্টে উপবৃত্তির টাকা সরাসরি পাঠিয়ে দেয়া হয়।

     এ জাতীয় আরো খবর