,

জকিগঞ্জে এবার সুপারির বাম্পার ফলন: গ্রামে গ্রামে উৎসবের আমেজ

আল মামুন, জকিগঞ্জ,সিলেট:

জকিগঞ্জের অর্থকারী ফসল সুপারী। ধাঁনের পর পরই যে ফসল জকিগঞ্জে অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলে তা হলো সুপারী।
এ বছর জকিগঞ্জে সুপারির বাম্পার ফলন হয়েছে। গত ১০ বছরের মধ্যে এবার ফলন ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা। ফলে জকিগঞ্জের গ্রামে গ্রামে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
সুপারি নিয়ে স্থানীয় প্রবাদ রয়েছে “মাছ, বাঁশ,সুপারি জকিগঞ্জের ব্যাটাগিরি। তাছাড়া “ইছামিতর পুয়া (ছেলে) চাপ ঘাটের গুয়া (সুপারি)”। প্রবাদটিও শুনা যায় মুখে মুখে। জকিগঞ্জ থেকে বাঁশ ফুরিয়ে যেতে বসলেও মাছ ও সুপারী চাষে চলছে নিরব বিপ্লব। সুপারি বছরে অনন্ত একবার এনে দেয় এ জনপদের মানুষের হাসির ঝিলিক।
নবান্নের উৎসবের মতোই অক্টোবর-নভেম্বর মাসে পুরো জকিগঞ্জে সুপারির উৎসব বসে। গাছ থেকে সুপারি পাড়া, চাতলে শুকানো, বিভিন্ন গ্রেডে ভাগ করা ও বাজারে নেয়ার কাজে নিয়োগ করা হয় শ্রমিক। জকিগঞ্জের প্রায় প্রতিটি পরিবারে এ সময়টা কাটে ব্যস্ততার মধ্যে। মানুষের চোখে-মুখে ফুটে উঠে অন্য রকম এক প্রাপ্তির উজ্জ্বল্য। উপজেলার প্রতিটি বাজারে প্রচুর সুপারি বিকিকিনি হয়। সপ্তাহে দু’দিন জকিগঞ্জ বাজার, বাবুর বাজার, শরীফগঞ্জ বাজার, কালিগঞ্জ বাজার, শাহগলী বাজারে সুপারীর বড় হাট বসে। এছাড়া উপজেলার প্রতিটি ছোটছোট বাজার থেকে ফরিয়ারা সুপারি ক্রয় করে বড় হাটে বিক্রয় করে থাকেন। অনেক ব্যাপারী তাদের স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে বসতবাড়ির সুপারি বাগানও অগ্রিম কিনে রাখেন। স্থানীয় অনেক ব্যবসায়ীও ফল পাকার আগেই নির্দিষ্ট দামে পুরো বাগান ক্রয় করে পর্যায়ক্রমে বিক্রি করেন। একেকজন বাড়ি মালিক সর্বনি¤œ ২০ হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকার সুপারি বিক্রি করে থাকেন বলে জানান মাইজকান্দির কামাল উদ্দিন।
সিলেটসহ পার্শ্ববর্তী জেলা সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ছাড়াও রংপুর, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, নীলফামারী, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ নানা জেলায় জকিগঞ্জের সুপারির রয়েছে বিপুল চাহিদা। মানের দিক থেকে জকিগঞ্জের সুপারি অন্য যেকোন জেলার চেয়ে ভাল, দামেও সস্তা। শুধু মাত্র জকিগঞ্জ বাজারেই হাটবারে ৬/৭ শত বস্তা সুপারি ক্রয়-বিক্রয় হয় বলে জানান পাইকারী বিক্রেতা কবির আহমদ।
রংপুর থেকে আসা সুপারি ক্রেতা আজিজুর রহমান জানান দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে জকিগঞ্জ থেকে সুপারি কিনে রংপুরের আশপাশের জেলাগুলোতে বিক্রি করছেন। তিনি বলেন তাছাড়া রংপুর অঞ্চলে সুপারির মৌসুম যখন শেষ হয়ে যায় তখনও জকিগঞ্জের বাজার থাকে জমজমাট। সে কারণে জকিগঞ্জের সুপারির প্রচুর চাহিদা রয়েছে ঐ অঞ্চলে। সিলেটের কাজির বাজারের সুপারীর আড়ৎই মুলত জকিগঞ্জের সুপারীর উপর নির্ভরশীল।
গত ১০ বছরের চেয়ে সুপারির ফলন এবার ভালো হয়েছে । গতবার “ভি” (৪৪০টি) প্রতি ৫শ থেকে ৬শ টাকা বিক্রয় হলেও এবার বিক্রি হচ্ছে ৬শ থেকে ৯শ টাকায়। স্থানীয় ভাষায় সুপারিকে গুয়া বলা হয়ে থাকে। এর হিসাব নিকাশটাও একটু ভিন্ন। ১১টি সুপারি একত্রে এক ঘা এবং ৪০ ঘা’ তে এক “ভি”। স্থানভেদে এর এর ভিন্নতাও আছে।
সুরমা-কুশিয়ারা বেষ্টিত সীমান্ত উপজেলা জকিগঞ্জের যেদিকে তাকাবেন চোখে পড়বে সারি সারি সুপারি গাছ। জকিগঞ্জের এমন কোন বাড়ী নেই যেখানে সুপারী গাছ নেই।
দেশের মানচিত্রের উত্তর-পূর্বাংশে মূল দেহ থেকে বাড়তি একটু জায়গাু নিয়েই জকিগঞ্জ উপজেলা। জকিগঞ্জে ঢুকে যেদিকে তাকাবেন চোখে পড়বে সারি সারি সুপারির গাছ। বাড়ির আঙ্গিনা, ক্ষেতের আইল, রাস্তার ধার, পুকুর পাড় সর্বত্রই দৃষ্টিনন্দন সুপারির গাছ।
উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের সবকটিতেই সুপারি ফলে ভালো। সুলতানপুর ও বারঠাকুরী ইউনিয়নের চাপঘাট পরগনার নাম করণটিও সুপারিকে নিয়ে। মুখের চাপায় (গালে) সুপারি ভরে লোকজন অনবরত চিবাত বলে এ এলাকার নাম হয় চাপঘাট। এছাড়া অত্যাধিক সুপারি উৎপন্ন হয় বলে সুলতানপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম রাখা হয়েছে “গুয়াবাড়ী”। আর সুপারি গাছে প্রচুর পিল্লা (বাবুই) পাখি বাসা করতো বলে বারঠাকুরী ইউনিয়নের একটি গ্রামের নামকরণ হয়েছে “পিল্লাকান্দি।
উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের হিসেবে গতবছর উপজেলার ২৭৮ একর জমিতে ফলবান ও ফলহীন মিলিয়ে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৫০০ সুপারি গাছে ১৯ হাজারা কেজি সুপারি উৎপাদিত হয়েছে। সুপারি প্রধান ফসল না হলেও এর উপর নির্ভর করা যায় নিশ্চিন্তে। বন্যা প্রবণ এলাকা জকিগঞ্জে পাহাড়ী ঢলের আকষ্মিকতায় নদীর দু’কূল চাপিয়ে পানি ঢুকে ফসলী জমিতে। বানের পানিতে ধান বা অন্যান্য ফসল সহজে নষ্ট হলেও তুলনা মূলক উঁচু স্থানে থাকায় সুপারি বাগানের তেমন ক্ষতি হয়না। তাছাড়া ফসল ফলানোর ব্যয়টিও কম। একবার গাছ লাগালে কমপক্ষে ত্রিশ বছর পর্যন্ত ফসল পাওয়া যায়।
একবীজপত্রী চিরসবুজ শাখা-প্রশাখাবিহীন বৃক্ষ সুপারির পানের সাথে বহুল ব্যবহার হলেও এই বৃক্ষের কিছুই ফেলার নয়। ঘরের জানালার শিক, কাঁচা ঘরের খুঁটি, চালের ফ্রেমসহ বিভিন্ন কাজে সুপারি গাছের ব্যবহার হয়। বাড়ির বেড়া দেয়া হয় সুপারির পাতা দিয়ে। সর্বোপরি শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে সুপারির জুড়ি নেই।
জকিগঞ্জের সুপারি ব্রিটিশ ভারতে খুবই খ্যাতি ছিল। ৪৭ পরবর্তীতে জকিগঞ্জই ছিল উভয় পাকিস্তানের একমাত্র সুপারির যোগানদার। তখন জকিগঞ্জে অবস্থাপন্ন গৃহস্থরা একরের পর একর জমিতে সুপারির বাগান গড়ে তুলেছিলেন। আশির দশকে হাজার হাজার সুপারি গাছ অজ্ঞাত রোগে মারা যায়। ফলে সুপারি চাষ ও পরিচর্যায় ভাটা পড়ে। বন্যার কারণেও প্রতি বছরই কমছে সুপারি গাছ। সুরমা- কুশিয়ারা নদীর ভাঙ্গনেও সুপারি বাগানের সংখ্যা কমার কারণ।
সাধারণতঃ ফেব্রুয়ারী-মার্চ মাসে সুপারি গাছে ফুল হয় এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ফল পাকে। সঠিক পরিচর্যা ও সুষম সার প্রয়োগ করা হলে ৪-৫ বছর বয়স থেকেই সুপারি ধরতে শুরু করে। তবে ১০-৪০ বছর বয়সের গাছ থেকেই অধিক ফল পাওয়া যায় বলে জানালেন ব্যবসায়ী বাবুল নাথ। ফুল আসা থেকে শুরু করে ফল পাকতে সময় লাগে ৯ থেকে ১০ মাস। সাধারণতঃ গাছ প্রতি ৩-৫ টি ছড়া এবং ছড়া প্রতি ৫০-১৫০ টি সুপারি ধরে। শুকনো সুপারির ফলন হেক্টর প্রতি ২-৭ টন বলে স্থানীয় লোকজন জানান।
অমৌসুমে দাম বেশী পাওয়া যায় বলে ব্যক্তি উদ্যোগেও সুপারি সংরক্ষণ করা হয়। জকিগঞ্জের কৃষি কর্মকর্তা আরিফুল হক বলেন, উচ্চ ফলনশীল জাত নির্বাচন, সঠিক পরিচর্যা আর উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করা হলে জকিগঞ্জে সুপারি ভবিষ্যৎ আরো উজ্জ্বল হবে। এ খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
সুপারি চাষ করে জকিগঞ্জের অনেক মানুষ স্বাবলম্বী হয়েছেন। তবে সঠিক দিক নির্দেশনা, উৎসাহ আর পরিচর্যার অভাবে এ খাত থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বছরে কোটি কোটি টাকার সুপারি উৎপাদিত হলেও অনেক সময় প্রকৃত সুপারি মালিকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। কৃষি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতা আর সরকারী সহযোগীতা পেলে জকিগঞ্জে সুপারি উৎপাদনে নব দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে স্থানীয় কৃষকরা মনে করেন।

 

     এ জাতীয় আরো খবর