,

দারুল কিরাতের সাড়ে ২২শ কেন্দ্রে সাড়ে চার লক্ষ শিক্ষার্থী এবার বিশুদ্ধ কুরআন শিখছেন

আল মামুন, জকিগঞ্জ::

আল্লামা ফুলতলী ছাহেব ক্বিবলাহ ও দারুল ক্বেরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট এক ও অভিন্ন এক নাম। সহিহ কুরআন শিক্ষা দেয়ার বিষয়টি নিয়ে আল্লামা ফুলতলীর ভাবনার ফসল দারুল কিরাত মজিদিয়া ট্রাস্ট। সেই ১৯৪৩ সালে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছাহেব ক্বিবলাহ শুরু করেন আল কুরআনের এ খেদমত। সহিহ শুদ্ধ কুরআন শিক্ষাকে সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে তিনি ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট। সেই থেকে আজ অবধি চলছে নিরবধি। প্রায় সত্তর বছরের দীর্ঘ পথচলায় দেশের সবচেয়ে বড় কুরআন শিক্ষার আসরে পরিণত হয়েছে দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট। শুধু দেশে নয় বিদেশেও দারুল কিরাতের রয়েছে ঈর্ষনীয় সাফল্য। এবার দেশে ২০৮৫টি শাখা ও বিদেশে ১৬৩টি শাখাসহ মোট ২২৪৮টি শাখার মাধ্যমে সহিহ কুরআন শিক্ষা দেয়া হচ্ছে চার লক্ষ ৪৯ হাজার শিক্ষার্থীকে।
সহিহ কুরআন শিক্ষার অনবদ্য প্রতিষ্ঠান দারুল কিরাতে মানুষকে তারতীল ও তাজবীদ সহকারে কুরআন শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে সর্বপ্রথম কুরআন শিক্ষার এ পদ্ধতি চালু করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুযুর্গ, শরীয়ত ও তরীকতের হাদী শামসুল উলামা আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)। এ প্রতিষ্ঠান থেকে ছয়টি জামাত (ক্লাস)-সূরা, আওয়াল, ছানী, ছালিছ, রাবে, খামিছ ও ছাদিছ শেষ করে উত্তীর্ণ ক্বারীরা অনুমতিক্রমে দেশের বিভিন্ন জায়গায় শাখা গঠন করে কুরআন শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। সময়ের পরিক্রমায় এ প্রতিষ্ঠানটি এখন মহিরুহে পরিণত হয়েছে। এ বছর ইংল্যান্ডে ৫০টি, ভারতে ১০০টি, আমেরিকায় ৯টি শাখা ছাড়াও স্পেন, কুয়েত, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে রয়েছে দারুল কিরাতের শাখা। উল্লেখ্য, এ বছর মায়ারমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন ২০টি কেন্দ্র সহ কক্সবাজার,বান্দরবান এলাকায় ৫০টি কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সকল কেন্দ্রই ট্রাস্টের পক্ষ থেকে পরিদর্শণ করা হয়। সকল শাখায় সিলেবাস, রুটিন ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ট্রাস্টের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়। সূরা থেকে ছালিছ জামাতের পরীক্ষা ২৫ ও ২৬ ররমজান, রাবে জামাতের পরীক্ষা ২৮ রমজান গ্রহণ করা হয়। খামিছ জামাতের পরীক্ষা সরাসরি ট্রাস্টের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয় বলে জানান কেন্দ্রের অফিস সহকারি মাওলানা জিল্লুর রহমান। এ বছর প্রধান কেন্দ্রে অনলাইনে শিক্ষার্থীদের আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। ছবিযুক্ত প্রবেশপত্রের মাধ্যমে দেশে প্রচলিত পাবলিক পরীক্ষার মতই পরীক্ষার সকল কার্যক্রম নেয়া হয়। অধিকাংশ খামিছ কেন্দ্রেগুলির পরীক্ষা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন ট্রাস্ট্রের জেনারেল সেক্রেটারী আল্লামা ইমাদ উদ্দীন চৌধুরী বড় ছাহেব কিবলাহ। প্রতিটি শাখায় গড়ে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। এ হিসেবে এবার চার লক্ষ ৪৯ হাজার শিক্ষার্থী দেশ বিদেশে সহিহ কুরআন শিখছেন। এ সব কেন্দ্রে ১৫ হাজারেরও বেশি ক্বারী শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। রমাজান মাস ছাড়া ১২৩ টি কেন্দ্রের মাধ্যমে বছর ব্যাপী দারুল কিরাতের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ছাদীছ উত্তীর্ণ ক্বারীদের সংস্থা ‘লতিফিয়া ক্বারী সোসাইটি’র সদস্যগণ পবিত্র কুরআনের খেদমত ছাড়াও নানা মানবিক কাজে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

দারুল কেরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্টের অনুকরণে দেশের বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসায় পবিত্র মহান কোরআন শরীফ শুদ্ধ করে পড়ার চর্চা সম্প্রসারিত হয়েছে। যার কৃতিত্ব আল্লামা ফুলতলীরই প্রাপ্য।

প্রতি বছর দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে শেষ জামায়াত (ছাদিছ) সম্পন্ন করার জন্য কয়েক হাজার ছাত্র প্রধান কেন্দ্র ফুলতলীতে আসেন। এ বছর ২৫৮৭জন ছাত্রীসহ প্রধান কেন্দ্রে প্রায় ৫ হাজার ৪শ ৯৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। ছাত্রীরা নিজ নিজ এলাকার কেন্দ্রে পড়ে ছাহেব বাড়ীতে এসে পরীক্ষা দেন শুধু। এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষার্থী দারুল কেরাতের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ছাদীস জামাত সম্পন্ন করেছেন। এখানে ছাহেব বাড়ির নিজস্ব তত্ত্বাবধানে থেকে ইফতার, সেহরী খাওয়াসহ মাসব্যাপী কেরাতের প্রশিক্ষণ নেন ছাত্ররা। শাখা বেড়ে যাওয়ায় শেষ জামাত ছাদিছে প্রতি বছর ভর্তি ইচ্ছুক ছাত্রদের সংখ্যা বাড়ছে। এতে স্থান সংকুলানের অভাব দেখা দেয়ায় অনেকেই ভর্তি হতে পারছেন না। পাশাপাশি বাড়ছে ব্যয়ের পরিধি। এ ব্যাপারে প্রধান কেন্দ্রের নাজিম আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহর ছোট ছাহেবজাদা ও আন্জুমানে আল ইসলাহর সভাপতি মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী বলেন, ছাহেব কিবলাহ দারুল কেরাতের নামে যে ৩৩ একর জায়গা ওয়াক্ফ করে গেছেন তা এতোদিন পরিবারের সম্পদের সাথে থাকলেও বর্তমানে আমরা তা টাস্ট্রের অধীনে নিয়ে এসেছি। পর্যায়ক্রমে এই জায়গা বিভিন্ন প্রজেক্ট করা হবে। এর আয় দিয়েই ব্যয়ভার বহন করা হবে। ছাহেব কিবলাহ কুরআনের এই খেদমতকে সর্বাগ্রে স্থান দিতেন। এ হিসাবে আমরাও তার এ খেদমতকে সকল খেদমতের উর্দ্ধে স্থান দেই। দারুল কেরাতের এ খেদমতকে প্রসারিত করতে যা যা লাগবে আমরা সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। আল্লামা ফুলতলী রহ. এর অনুপস্থিতিতেও দারুল কিরাত তাঁর দেখানো পথেই সুশৃঙ্খলভাবে সুচারুরুপে পরিচালিত হচ্ছে মহান কুরআন শরীফের বিশাল খেদমতে। আল্লাহ এ মেহনতকে কবুল করুন।

আল মামুন
৩১.৫.২০১৮

     এ জাতীয় আরো খবর