,

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ব্যর্থতা নিয়ে যা বললেন শিক্ষা সচিব

রশিদ আল রুহানী::
এ বছর এসএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সোহরাব হোসাইন। তিনি বলেন, ‘লাখ লাখ সৎ মানুষের মধ্যে যদি একজনও অসৎ হন, তাহলে সবার সততাকে ওই একজনই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেন। এ কারণে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি না, প্রশ্নফাঁস রোধ করা সম্ভব। ফলে এটি একটি অসহায় অবস্থা। যদি প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হয়, তাহলে সেটা হবে সৌভাগ্যের ব্যাপার।’ শনিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘অধিকাংশ শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী প্রশ্নপত্র ফাঁসকে ঘৃণা করেন। তারা বিষয়টিকে প্রশ্রয় দেন না। এরপরও এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাঠানোর সঙ্গে দশ হাজার শিক্ষক-কর্র্মকতা-কর্মচারী যুক্ত। একেক কেন্দ্রে একেকভাবে প্রশ্নপত্র যায়। এরমধ্যে রয়েছে স্পিড বোর্ড, রিকশাও। এছাড়া কোনও কোনও কেন্দ্রে পায়ে হেঁটেও প্রশ্ন পৌঁছে দেওয়া হয়। এজন্য কোথাও কোথাও ট্রেজারি বা থানা থেকে প্রশ্ন নিতে হয় সকাল ৯ টা বা তারও আগে। কারণ সঠিক সময়ে কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পৌঁছাতে হবে। প্রত্যেক থানা বা ট্রেজারি থেকে কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগে তিন জন সরাসরি এর দায়িত্বে থাকেন। এখন কাকে সন্দেহ করবো? সারাদেশে প্রশ্নপত্রের সঙ্গে যুক্ত ১০ হাজার কর্মকর্তার মধ্যে ৯ হাজার ৯৯৯ জনও যদি সৎ হন, আর মাত্র একজন যদি অসৎ হন, তাহলেই সেই একজন অসৎই লাখ লাখ মানুষের সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারেন। এই ক্ষেত্রে আমরা কী করতে পারি?’

শিক্ষা সচিব বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রে সাড়ে সকাল ৯ টায় প্রবেশ করতে বাধ্যতামূলক করেছি। কিন্তু এটা নিয়েও তো অনেক সমালোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, কেন সকাল সাড়ে নয়টায় কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে? আমরা কোনোভাবেই প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে না পারায় আধা ঘণ্টা আগে প্রবেশ করিয়ে যদি কিছুটা এর প্রভাব কমানো যায়, সে উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সকাল ৯ টার মধ্যেই প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়। এছাড়া বিজি প্রেসকেও আমরা অনেক নিয়ন্ত্রণে এনেছি। আগে বিজি প্রেসে প্রশ্নপত্র দেখতে পারতেন ২৮ জন। সেখান থেকে কমিয়ে ১৮ জনে আনা হয়েছে। সুতরাং সেখান থেকে হয়তো প্রশ্নপত্র ফাঁসটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। তবে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে আমি বলতে পারবো না। এটা একটা অসহায় অবস্থা।’

যেসব ফেসবুক গ্রুপ ও পেজে প্রশ্ন আসছে, সেগুলোর পোস্টকারী তার ফোন নম্বরও দিয়ে দেন। তাহলে তাদের শনাক্ত করা কি অসম্ভব—জানতে চাইলে শিক্ষা সচিব বলেন, ‘সেটা কি বিটিআরসি দেখছে না? বিটিআরসির দায়িত্ব আছে না? তাদের মন্ত্রণালয় কি দেখছে না? তাদের মন্ত্রণালয়ের যত কর্মকর্তা আছেন, তারা কি দেখছেন না?’ তিনি বলেন, ‘ফেসবুক বন্ধ করা সম্ভব নয়। যখন একটি ফেসবুকে একটি প্রশ্ন আসছে, তখন থেকে বন্ধ করতে করতে এরই মধ্যে পরীক্ষা শেষ হয়ে যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ থেকে নয়, বিশ্বের যেকোনও জায়গা থেকেই ফেসবুক খোলা হয়। বাংলাদেশ থেকে খুললে হয়তো সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু বাইরে থেকে যারা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলছেন, তাদের অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করতে হলে অনেক ঝামেলা আছে। বিকাশসহ বাংলাদেশে যেসব ক্যাশ ট্রান্সফার এজেন্সি আছে, প্রত্যেকের স্টেটমেন্ট নিতে পুলিশকে বলেছি। টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র নিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার মতো পরীক্ষার্থী যদি পাই, তাহলে তার বিষয়েও আমরা সিদ্ধান্ত নেবো। আমাদের পুলিশ প্রশাসন আপ্রাণ চেষ্টা করছে, তাদের খুঁজে বের করতে।’
প্রশ্নপত্র ফাঁসের সমালোচনা করে শিক্ষা সচিব বলেন, ‘২০১৪ সালে একটি অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছিলাম, যে প্রক্রিয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, সে প্রক্রিয়া রোধ করা খুব কঠিন। এ কারণে পরীক্ষা-পদ্ধতির পরিবর্তন আনার জন্য একটি চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়েছিল। সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর সামনে একটি মনিটর থাকবে। কেন্দ্রীয়ভাবে সঠিক সময়ে প্রশ্নপত্র ভেসে উঠবে পরীক্ষার্থীর সামনে। একেক বোর্ডে একেক প্রশ্নপত্র থাকবে। অটোমেশন সিস্টেমে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হবে। একমাত্র এভাবেই সম্ভব এই সমস্যার সমাধান করা। এছাড়া আরও কিছু সুপারিশ নিয়ে কাজ করছে একটি কমিটি। শুধু তাই নয়, অধ্যাপক কোয়কোবাদকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছি। সেই কমিটিও কাজ করছে। ওই কমিটির সুপারিশ, কেন্দ্রে কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে পরীক্ষা নিতে হবে। যদিও সেটা অনেক কঠিন। যেমন, যদি সেখানেও খুব ভালো গোপনীয়তা যদি না থাকে, তাহলে সেখান থেকেও যে প্রশ্নপত্র বাইরে যাবে না, তার নিশ্চয়তাও কোথায়? সেখানেও তো হাজার লোক অন্তর্ভুক্ত হবে। দেশে প্রায় ৩০ হাজার কেন্দ্র আছে, আবার কিছু উপকেন্দ্রও আছে। এটা একটি বিশাল কাজ। তবে কিভাবে সম্ভব, তা নিয়ে কাজ করছি।’

একটি পরীক্ষা বাতিল করতে হলে অনেক কিছু ভাবতে হবে উল্লেখ করে শিক্ষা সচিব বলেন,‘এটি একটি কমিটির মাধ্যমে করতে হবে। সবার অভিমত নিয়ে করতে হবে। কারণ, সকাল ৯ টায় যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, তাহলে কি সবাই সেই প্রশ্ন পায়? পায় না। ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে হয়তো হাতেগোনা কয়েক জন পায়। যারা প্রশ্নপত্র পেয়েও বিশ্বাস না করে পড়াশোনা করছে, তারা তো সৎ। পরীক্ষা বাতিল করলে ওই সৎ শিক্ষার্থীরা ক্ষতির শিকার হবে। আসলে এর সঙ্গে অনেক বিষয় জড়িত।’ বলা যতটা সহজ বাস্তবতা আরও অনেক কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (১ ফেব্রুয়ারি) এসএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথম পত্র এবং শনিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলা দ্বিতীয় পত্রের বহু নির্বাচনি অভীক্ষার (৩০ মার্ক) প্রশ্নপত্র পরীক্ষা শুরুর একঘণ্টা আগে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় পরিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকসহ সব মহলকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠ দেখা দিয়েছে। সমালোচনার মুখে পড়তে হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষামন্ত্রীকেও।

     এ জাতীয় আরো খবর