,

বঙ্গ ভাষা ও সাহিত্য

মোক্তার আহমদ চৌধুরী::
মাতা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষা এ তিনটি ব¯‘ মানুষের কাছে বহুল পরিচিত। জন্মের পরই তার কাছে এগুলো পরিচিতি লাভ করে। তিনটি ব¯‘ সমভাবে মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার ব¯‘। এদের প্রতি তার প্রেম হয় নিবিঢ়। কোন প্রলোভন এ প্রেমকে কেড়ে নিতে পারে না। বাঙালি জাতির মাতৃভাষা বাংলা। বঙ্গ ভাষার উৎপত্তিকাল নির্ণয় করা কঠিন। কতিপয় মূল ভাষা হতে যাবতিয় সব ভাষার উৎপত্তি। এদের একটি ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা। অর্থাৎ উক্ত আদী আর্য ভাষা গোষ্ঠী থেকে উদ্ভুত সব ভাষাই বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত। খ্রীষ্ঠ পূর্ব প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিলো। পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর এক দল ভারতে আসে। তাদের ভাষা পরিচিত আর্য ভাষা রূপে। ঋকবেদে আছে ইন্দো ইউরোপীয় ভাষার নিদর্শন। আর্যরা ভারতে আসার সময় বলবান বৈদিক ভাষা ও দেবগীতি মূলক সাহিত্য সঙ্গে নিয়ে আসে। আর্যরা অনার্যদের ভাষা ও সংস্কৃতি আত্মসাৎ করে তাদের ভাষার প্রতিপত্তি ¯’াপন করে। আর্য অনার্য জল বায়ূগত কারণে একত্রে মেশার ফলে এদের ভাষা সমূহ নতূন রূপ পরিগ্রহ করে। ভাষা বহতা নদীর মতো বহমান। এটা প্রতিকূল পরিবেশে আপন চলার পথ বেছে নেয়। এতে করে প্রাকৃত ভাষার জন্ম হয়। প্রাকৃত শব্দ দিয়ে সাধারণ মানুষদের বুঝায় তাদের মুখের ভাষাই প্রাকৃত। পরবর্তীকালে প্রাকৃত ভাষা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রভাবে ও কথ্য ভাষার উ”চারণের ভিন্নতানুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন আকার ধারণ করে। ‘প্রাকৃত’ ভাষা আঞ্চলিক ভিন্নতা নিয়ে বিভিন্ন নামে চিহ্নিত হয়। ‘মাগধী’ প্রাকৃত, ‘মহারাষ্ট্রী’ প্রাকৃত, ‘শৌরসেনী’ প্রাকৃত। ‘মাগধী’ প্রাকৃত এর অপভ্রংশ হতে বিবর্তীত ও পরিবর্তীত হয়ে খ্রীষ্ঠীয় দশম শতাব্দীতে আমাদের বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়। প্রত্যেক জাতিরই একটি মাতৃভাষা আছে। এর আবেদন জাতির কাছে চির অম্লান ও চির ভাস্বর। উপাচার্য সৈয়দ আলী আহসান বলেছেন, ‘‘মাতৃভাষার সাহায্যে মানুষ সকল ব¯‘র নাম উ”চারণ করে, পার্থিব সকল বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে এবং অপার্থিব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে।’’ এর মাধ্যমে যেভাবে ই”েছ মতো মনের ভাবকে প্রফুল্ল চিত্তে, সুন্দর ও সুললিত ভাবে প্রকাশ করা যায়, অন্যভাষায় এভাবে করা যায় না, তা সে যত ভালোভাবেই আয়ত্ত্ব করা যাকনা কেন। মনুষ্য মনের চিন্তা, কল্পনা, সুখ দু:খ ও হর্ষ বিশাদকে আঁকড়ে রয়েছে তার প্রান প্রিয় মাতৃভাষা। এটাই আবেগ ও অনুভূতির সর্বশ্রেষ্ঠ বাহন। কবি আব্দুল হাকিমের উক্তি:
‘‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়া-এ
নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশে না যা-এ।’’
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। জন্মের পরই আমরা আস্তে আস্তে এ ভাষার সাথে পরিচিত হই। এ ভাষায় কথা বলা আমাদের মজ্জাগত অভ্যাস। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। এর প্রতি রয়েছে প্রাণের টান। আমাদের মনের মণিকোঠায় বিরাট ¯’ান দখল করে নিয়েছে বঙ্গ ভাষা। অষ্টাদশ শতাব্দীতে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের মাধ্যমে বাংলা গদ্যের সূত্রপাত ঘটে। বঙ্গ ভাষাকে সাহিত্যিক গদ্যে উত্তীর্ণ করতে যেয়ে ভাষায় যতি, দাড়ি, কমা, সেমিকোলন হতে শুরু করে বাংলা ভাষাকে রসাপ্লুত করে তুলতে হিন্দু জাতির সবশ্রেষ্ঠ পন্ডিত রাজা রামমোহণ রায় ও পন্ডিত প্রবর ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অসামান্য ও অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। ইশ্বরচন্দ্রই প্রথম গদ্যে যতিচিহ্নের যথাযথ ব্যবহার করে বাংলা গদ্যে শৃঙ্খলা আনয়ণ করেন। তাঁকে বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী বলা হয়। পরবর্তী যুগে মহাকবি মাইকেল মধুসুধন দত্ত মীর মশরাররফ হোসেন, শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, বিভূতি ভূষণ বন্দোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, সুকান্ত ভট্টাচার্য, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মহাকবি কায়কোবাদ, ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, প্রভাত কুমার মুখপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিহারীলাল চক্রবর্তী, প্রমথ চৌধুরী, কবি আব্দুল কাদির, কবি তালিম হোসেন, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, অতুল প্রসাদ সেন, কবি নির্মলেন্দু গুণ, পল্লী কবি জসিম উদ্দিন, ড. ঈসমাইল হোসেন সিরাজী, কবি কামিনী রায়, কবি সুফিয়া কামাল, ডা. লুৎফুর রহমান, সৈয়দ মুজতবা আলী, মুহাম্মদ বরকত উল্লাহ, কবি ফররুখ আহমদ, কবি গোলাম মোস্তফা, সূফী সাধক হযরত মাওলানা সেলিম উদ্দিন ওরফে শাহ শিতালং ফক্বীর (রহ.) সূফী সাধক মাওলানা ইবরাহিম তশনা (রহ.), মরমী কবি ফক্বির লালন শাহ, দ্বেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী, মরমী কবি আরকম শাহ, মরমী কবি দুরবীন শাহ, মরমী কবি কালা শাহ, বাউল রাধা রমন, কানাই লাল, অধ্যাপক মোতাহার হোসেন চৌধুরী, অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, কবি চন্ডিদাশ, কবি সুকুমার রায়, কবি কাজী কাদের নেওয়াজ, কবি কালিদাস রায়, কবি শামসুর রহমান, অধ্যাপক ড. আব্দুল হাই, খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ, আবুল মনসুর আহমদ, কবি ভারত চন্দ্র, সৈয়দ আবুল হোসেন, দিনবন্ধু মিত্র, রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী, সৈয়দ ওয়াজেদ আলী, ইয়াকুব আলী চৌধুরী, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, কবি আহসান হাবীব, প্রমুখ প্রতিভাশালী কবি সাহিত্যিক গণের লিখনী ও রচনা দ্বারা বঙ্গভাষা ও সাহিত্য ব্যাপক সমৃদ্ধি লাভ করেছে। বাংলা ভাষার ক্রমবিকাশের দ্বারা চলতে থাকে। পন্ডিত ও কবি সাহিত্যিকগণ স্বীয় প্রতিভাবলেই বাংলা সাহিত্যের শূন্য ভান্ডার পূর্ণ করে চলছেন। বাংলার তিনজন ও প্রতিদ্বন্দ্বী কবি হ”েছন কবি গুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও মহাকবি মাইকেল মধুসুধন দত্ত। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় সার্বজনীন আবেদন থাকায় তাঁকে বিশ্বকবি বলে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি তাঁর বিখ্যাত গীতাঞ্জলী কাব্য রচনার জন্য নোবেল পুরষ্কার পেয়ে বঙ্গভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্ববাসীর নিকট পরিচিত করে দিয়েছেন। অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই বলেছেন, ‘কাব্য ও সাহিত্যে আমি কি দিয়েছি জানিনা তবে সংগীতে আমি যা দিয়েছি, যদিও আজ তার কোন আলোচনা হয় না, ভবিষ্যতে যখন আলোচনা হবে, ইতিহাস রচিত হবে, তখন সবাই আমার কথা স্মরণ করবেন এ বিশ্বাস আমার আছে।’ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত রচয়িতাদের অন্যতম। বাংলা ভাষায় নজরুলের মতো এতো অধিক সংখ্যক গীতি কবিতা আর কোন কবি লিখতে পারেননি। মাইকেল মধুসুধন দত্ত বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কবি। তিনি বাংলা কাব্যে চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তক। এ ধরনের কবিতা রচনা করেই বাঙালিকে পরমানন্দ দিয়েছেন তিনি। অলক্ষ্যে ও খামখেয়াল বশত: মাতৃভাষা বাংলাকে ভূলে ইংরেজী সাহিত্য প্রণয়নে মনোনিবেশের মাধ্যমে মাইকেল জনৈক ইংরেজ সাহিত্যিক কর্তৃক মোক্ষমভাবে লাঞ্চিত ও অসম্মানিত হন। পরে মাতৃভাষা বাংলা চর্চা ও সাহিত্য গবেষনার মধ্যমে তাঁর টনক নড়লে তিনি চতুর্দশপদী কবিতায় প্রথমেই লিখেন, ‘‘হে বঙ্গঁ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন, তা সবে অবোধ আমি অবহেলা করি পরধন লোভে মত্ত করিনু ভ্রমন।’’ প্রখ্যাত কবি বিহারী লাল চক্রবর্তী। বাংলা ‘গীতি কবিতার বিশুদ্ধ রূপটিকে তিনিই প্রথম সৃষ্টি করেন।’ তাঁর কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ ‘আধুনিক বঙ্গ সাহিত্যে এই প্রথম বোধ হয় কবির নিজের কথা।’ কবি ভারতচন্দ্র ‘‘বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাগরিক কবি এবং বাংলা কাব্যে নতূন ব্যঞ্জনার প্রবর্তক।’’ গোবিন্দ চন্দ্র দাশ উক্ত সাহিত্যের স্বভাব কবি, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দ্বের যাদুকর। শরৎ চন্দ্র কথা শিল্পী। বাংলা ভাষায় বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্য স¤্রাট। আধুনিক যুগে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ। আমি নিজে তাঁর কবিতা আবৃত্তি করেছি দেখেছি বঙ্গ সাহিত্যে উনার কবিতাগুলো সবচাইতে বেশি আবেগময় ও প্রেমতাত্বিক। বাংলাদেশের অন্যতম মুসলিম দার্শনিক সৈয়দ আবুল হোসেন। তিনি একাধারে কবি ও লেখক। বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ আবুল হোসেন একধরণের অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেন, যা ‘হোসেনী ছন্দ’ নামে খ্যাত। ড. লুৎফুর রহমান প্রবন্ধ বিশরাদ। তিনি হন জ্ঞান ও হৃদয় বৃত্তির পরিচর্যা মূলক ব্যক্তি বাদী প্রবন্ধ লেখক। ড. আব্দুল হাই তাঁর ‘আমাদের সাহিত্যের ভাষা’ নামক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘‘ভাষার সুষমা ও শ্রুতি মধুর গুণ না থাকলে ভাব যেমনি হোক না কেন সাহিত্য যথার্থ মর্যাদা ও ¯ি’তি লাভ করবে না।’’ এ সমুদয় বঙ্গ ভাষা ও সাহিত্যেরই গৌরব। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মর্যাদা নিছক কম নয়। তার শ্রুতিমাধুর্যও অনেক বেশি। বিশ্বে বাংলা ছয়, সাত বা আট নম্বর ভাষা। পৃথিবীর প্রায় ত্রিশ কোটি মানুষ বঙ্গ ভাষায় কথা বলে। বলা বাহুল্য জাতিসংঘে বক্তব্যের মাধ্যম হিসেবে আধুনিক যুগে যে আটটি ভাষা গৃহীত ও সমাদৃত হয়েছে বাংলা ভাষা এদের অন্যতম। তথাপি আমরা বাঙালিরা অনেক সময় মাতৃভাষা বাংলায় পান্ডিত্য অর্জন করার আগে বিদেশী ভাষায় বুৎপত্তি অর্জন করে নিই। ভূলেও ভেবে দেখিনে যে মাতৃভাষা শেখার আবশ্যকতা ঢের বেশি। বিদেশী ভাষা ও সাহিত্যের চাপে পড়ে আমরা প্রায়শঃ বাংলা ভাষা চর্চায় ও ব্যবহারে নাসিকা কুঞ্চিত করি, একে অবজ্ঞা করে দূরে ঠেলে রাখি, এর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হই। মাতৃভাষাকে অবহেলা করার মানে এর মর্যাদায় আঘাত হানা। মায়ের ভাষাকে হেয় চোখে দেখে বিশ্বের কোন জাতি উ”চাসন লাভ করতে পারে না। বাঙালি জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিদেশী সভ্যতা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রভাব পরিলক্ষিত। আমরা বাঙালিরা নিজেদের জাতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভূলে গিয়ে বিদেশী সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছি। তার পরিণাম ফল বিভীষিকাময়। যে জাতির নিজস্ব ভাষা ও সাহিত্য যত উন্নত সে জাতির সভ্যতা সংস্কৃতি ও তত উন্নত। সাহিত্য আত্মার দর্পণ। এটাই মানুষকে প্রকৃত সুখ ও পরমানন্দ দিতে পারে। দেহের পুষ্টির জন্য যেমন পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও সুষম খাদ্যের প্রয়োজন ঠিক তেমনি আত্মার পুষ্টির জন্য উত্তম সাহিত্য, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজন। সাহিত্য দর্পণ। এটা মানব জীবন ও জগতের দর্শণ। সাহিত্যের অমৃত রূপ রস আস্বাদনে মাতৃভাষাই সবচেয়ে বেশি সহায়ক। হে বাঙালি, দয়া করে একবার তোমার হৃদয়খানি বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের মহাসমুদ্রে অবগাহন করাও দেখবে হৃদয় পরমানন্দের মহাসমুদ্রে অবগাহন করেছে ও তোমার আত্মা প্রশান্তিময় জগতের মহাসাগরে সিক্ততা লাভ করেছে। সমুদয় শিক্ষাই ভাষা শিক্ষা। মাতৃভাষা চর্চার রস ও নৈপূণ্যতা অন্য ভাষা আয়ত্ব করণে সহায়ক। কবির ভাষায়:
আমি বাংলায় গান গাই
আমি বাংলার গান গাই।
আমি বাংলায় ভালোবাসি, আমি বাংলাকে ভালোবাসি
আমি তারই হাত ধরে, সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে আসি।

বাংলা ভাষার কথা বলতে গেলে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে রচিত সেই অভিস্মরণীয় ভাষা আন্দোলনের কথা স্মৃতিপটে জাগ্রত হয়। তৎক্ষণাৎ শরীর শিউরে ওঠে। সেদিন আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলা ভাষা চরম দুর্যোগের ঘণঘটার সম্মুখীন হয়েছিলো। তৎকালীন পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন কুচক্রী শাসকবর্গ বাংলা ভাষাকে উ”েছদ করে এর ¯’লে উর্দূকে আমাদের রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়ে ছিলো। তারা চেয়েছিলো এদেশের ভাষাগত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে পঙ্গু করে দিতে। তখন দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণ উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে সো”চার ও প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে। সে সময় বাংলাদেশের পন্ডিত প্রবর, বহু ভাষাবিদ, জ্ঞান তাপস, চলিষ্ণু বিদ্যাকল্পদ্রুম ড: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর রচিত ‘‘আমাদের সমস্যা’’ নামক গ্রš’টি ছাত্র, শিক্ষক ও সুধীবৃন্দের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করে ভাষা আন্দোলনকে ত্বরান্বীত করেছিলেন। অবশেষে মাতৃভাষা বাংলার দাবীতে ছাত্র সমাজ তাদের বুকের তপ্ত রক্ত দিয়ে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত করে দিলো। ছাত্র সমাজের এ আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি সেদিন। ভাষা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত জনগণকে স্বাধীনতা আন্দোলনের অনুপ্রেরণা দিয়েছিলো। কবি শামসুর রহমান তাঁর কবিতায় লিখেনঃ
‘‘তোমাকে পাবার জন্য, হে স্বাধীনতা
তোমাকে পাবার জন্য।”
কবি ও গীতিকার অতুল প্রসাদ সেন বলেছেন:
“মোদের গরব মোদের আশা
আ মোরই বাংলা ভাষা।”
বলতে হয় বাংলা ভাষা আমাদের পরম শ্রদ্ধার ব¯‘। এর উষ্ণ আবেদনকে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। এটা আমাদের সর্বপ্রকার ভাব প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম। বাংলা ভাষায় প্রকৃত জ্ঞানার্জন সম্ভব। বাংলা পরিপূর্ণ ভাষা। একে ভূলেও অবজ্ঞা করা যায়না। বাংলা ভাষার উন্নতি মানেই আমাদের উন্নতি। এ ভাষার সাহিত্য আমাদের আত্মার পুষ্টি সাধন করতে পারে। বহু ত্যাগ তিথীক্ষার বিনিময়ে আমরা বাঙালিরা আমাদের ভাষার সম্মান ও মর্যাদাকে অক্ষুণœ রেখেছি। বাঙালির মনের আসনে বঙ্গভাষা চিরদিন সমাসীন হয়ে থাকবে। লেখক: মোক্তার আহমদ চৌধুরী,সহকারি স্বাস্থ্য পরিদর্শক

==০==

     এ জাতীয় আরো খবর