,

বিশ্ব শিক্ষক দিবস : শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণই বেসরকারি শিক্ষক সমাজের প্রত্যাশা

এস এম খায়রুল বাসার :

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসম্বের এক ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করি। স্বাধীনতার ৪৬ বছরে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি আজ পুষ্প-পল্লবে সুশোভিত। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ নিন্দুকের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ তো নয়-ই, বরং বাংলাদেশকে ‘ইমাজিং টাইগার’, ‘নেক্সট ইলেভেন’ ‘ফ্রন্টিয়ার ফাইভ’, ‘থ্রিজি বলে প্রশংসা করছে আন্তর্জাতিক দাতা ও গবেষণা সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞরা।

পাকিস্তানের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পাকিস্তানের চেয়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশ আজ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছ। এ অর্জনে শিক্ষা খাতের অবদান অসামান্য বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকালীন সময়ের পূর্বে একটি মধ্যম আয়সম্পন্ন স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি এবং ২০৪১ সালের মধ্যে জাতির পিতার স্বপ্নের উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হওয়ার বিরাট চ্যালঞ্জে এদেশের সম্মুখে। এই সমস্ত সম্ভাবনা ও চ্যালঞ্জের মোকাবেলা ও সাফল্য অর্জনের জন্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন টেকসই করতে মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যম হিসাবে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই।

শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ছাড়া দেশের অগ্রগতি অকল্পনীয়। আর শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি শিক্ষক। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, পেশা হিসেবে শিক্ষকতা বাংলাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। গোটা শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭ ভাগ নিয়ন্ত্রণকারী বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থসামাজিক অবস্থা আজও চরমভাবে অবহেলিত। সরকারি শিক্ষকদের অনুরূপ জাতীয় স্কেলে ৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, পূর্ণ উৎসব ভাতা ও পূর্ণ পেনশন, বৈশাখী ভাতা আমরা পাই না।

বেসরকারি শিক্ষকদের পদোন্নতিসহ পেশাগত দাবি আজ উপেক্ষিপ্ত। বছরের পর বছর এমপিও বঞ্চিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক কর্মচারীদের পাশাপাশি অনার্স, মাস্টার্স পাঠদানকারী বেসরকারি কলেজের শিক্ষক, ডিগ্রি কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে তৃতীয় শিক্ষকরা করছেন মানবেতর জীবন-যাপন। শিক্ষক-কর্মচারীদের কর্মসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দুর্নীতি তো আছেই।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে ধারণ করে দেশের শিক্ষক সমাজ বিশ্বাস করে একমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক হস্তক্ষেপই পারে বেসরকারি শিক্ষকদের এই বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করতে। একটি দেশে দু’ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা চাচ্ছি না। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন ভাতা ও মর্যাদাগত বৈষম্য আজ শিক্ষা ব্যবস্থায় সংকট সৃষ্টি করেছে। এই সংকট উত্তরণ করে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের পর্বতসম বৈষম্য দূর করার একমাত্র পদ্ধতিই হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ। আর বেসরকারি শিক্ষা খাত জাতীয়করণের রোডম্যাপ ঘোষণ করার দাবি আমরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছেই করতে চাই।

কেননা জাতীয়করণের প্রক্রিয়া শুরুই করেছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পিতা বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে দেশে চরম আর্থিক অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু ৩৭ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি শিক্ষককে জাতীয়করণ করে শিক্ষা জাতীয়করণের ক্ষেত্রে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। মাওলানা ভাসানীর অনুরোধক্রমে বঙ্গবন্ধু কাগমারীর মোহাম্মদ আলী কলেজকে জাতীয়করণ করেছিলেন। পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত গুণাবলির অংশ হিসাবেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি সারাদেশে ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। শিক্ষকদের আন্দোলন ছিল শুধু রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের।

কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুধু রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, আন-রেজিস্টার্ড, স্থায়ী, অস্থায়ী নিবন্ধনপ্রাপ্ত, পাঠদানে অনুমতিপ্রাপ্ত, কমিউনিটি, এনজিও পরিচালিত, পাঠদানের অনুমতির সুপারিশপ্রাপ্ত এবং পাঠদানের অনুমতির অপেক্ষাধীন সব প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছেন। যা অবশ্যই ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২৮৫ কলেজে এবং ৭৩টি বিদ্যালয় জাতীয়করণের চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছেন। আমরা মনে করি এতে করে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য আরো বাড়বে। আমরা চাই প্রধানমন্ত্রী যেমন একই সাথে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই একই ধারাবাহিকতায় তিনি একসাথে সকল বেসরকারি স্কুল-কলেজ জাতীয়করণের ঘোষণা দিবেন।

শিক্ষকরা জাতি ও মানুষ গড়ার কারিগর। তাদের অবহেলা ও বঞ্চনার মধ্যে রেখে জাতির উন্নয়ন হতে পারে না। ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে তাই বেসরকারি শিক্ষকদের বহুবিধ বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট বিনয়ের সাথে নিম্নোক্ত দাবিসমূহ পেশ করছি : এক. অবিলম্বে বার্ষিক পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বকেয়াসহ দিতে হবে। দুই. অবিলম্বে বর্তমান স্কেলে সরকারি শিক্ষকদের অনুরূপ বাড়ি ভাড়া দিতে হবে।

তিন. অবিলম্বে বর্তমান স্কেলে সরকারি শিক্ষকদের অনুরূপ পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা দিতে হবে। চার. অবিলম্বে সরকারি শিক্ষকদের অনুরূপ চিকিৎসা ভাতা দিতে হবে। পাঁচ. অবিলম্বে সরকারি শিক্ষকদের অনুরূপ বৈশাখী ভাতা দিতে হবে। ছয়. অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের ভাতার পরিবর্তে অবসরকালে পূর্ণ পেনশন দিতে হবে।

সর্বোপরি, বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ না করে সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালার ভিত্তিতে যত দ্রুত সম্ভব গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের রোডম্যাপ ঘোষণা করার দাবি জানাচ্ছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকার অবসান ঘটাবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সেই প্রত্যাশায় রইল বেসরকারি শিক্ষক সমাজ।

[লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক]

     এ জাতীয় আরো খবর