,

ভিত্তি প্রস্তরেই ১৮ বছর আটকে আছে জকিগঞ্জ পৌরভবনের স্বপ্ন

আল মামুন, জকিগঞ্জ::
সিলেটের জকিগঞ্জ বাংলাদেশের জেলাগুলোর মধ্যে জেলা সদর থেকে সবচেয়ে দূরত্বের উপজেলার নাম। জেলা সদর থেকে এ উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৯১ কিলোমিটার। সীমান্তবর্তী এ উপজেলা সদরকে ১৯৯৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পৌরসভায় উন্নীত করা হয়। পৌরসভা ঘোষিত হবার পূর্বেই মাইজকান্দি গ্রামের প্রয়াত আব্দুল মন্নান স্থানীয় সরকারের চাহিদা মতো একবিঘা জমি বিনামূল্যে দান করেন। একই বছর তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ সেই জমিতে জকিগঞ্জ পৌরভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ভিত্তি স্থাপনের ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও নির্দিষ্ট স্থানে এখন পর্যন্ত পৌরভবন নির্মাণের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পৌরভবনের এ ভিত্তিপ্রস্তর ‘ভিত্তিহীন’।
বর্তমান মেয়র খলিল উদ্দিন নির্বাচনের আগে মাইজকান্দির নির্ধারিত স্থানে পৌর ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন ভবন নির্মাণের জন্য ৫০ শতক জায়গা লাগে ঐখানে আছে ২৮ শতক। ভবনের জন্য বরাদ্ধ প্রাপ্তির পর পৌরবাসীর সাথে আলাপ আলোচনা করে সুবিধাজনক স্থানে পৌরভবন নির্মাণের চেষ্টা করবো।
জকিগঞ্জ পৌরসভার প্রথম পৌরনির্বাচন হয় ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ। নয়টি ওয়ার্ডের এ পৌরসভায় লোকসংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। এর মধ্যে মোট পরিবারের সংখ্যা ২ হাজার ৮৪৫টি। সাত দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পরেও সেই গ্রাম্য কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রত্যাশিত কোনো উন্নয়নও নেই।
‘পৌরসভা শহর কোথায়….? জকিগঞ্জে প্রথম আসলে যে কারও কিছুটা খটকা লাগতে পারে। সরু একটা ভাঙাচোরা পিচঢালা রাস্তা, তার নাম‘মেইন রোড’। যত্রতত্র রিকশা-অটোরিকশা-মিনিবাস দাঁড় করানো। বাস স্টেশনের অভাবে পুরো এলাকাকেই যেন বাস স্টেশন মনে হয়। এক খন্ড ফাঁকা জায়গাকে শিশু পার্ক বলা হলেও সেটি ভরে আছে ময়লা আবর্জনা আর ঝোপজারে। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ আর ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ কোদানপাট। আশপাশে ডানে-বায়ে, কিছু দালানকোঠা, টিনশেডের দোকান আর কিছু গলিপথ। আর এটাই হচ্ছে জকিগঞ্জ পৌরসভা।
প্রতিষ্ঠাকালে একজন পৌর প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয় জকিগঞ্জ পৌরসভায়। উপজেল কমপ্লেক্সের ভেতরের একটি ছোট্ট টিনসেডের ঘর ভাড়া করে পৌরসভার পথচলা শুরু হয়। অদ্যাবধি সেখানেই চলছে পৌরসভার কার্যক্রম। ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ পৌরসভার প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর আরো তিনজন মেয়র নির্বাচিত হলেও এখন পর্যন্ত বর্তমান পৌর কর্তৃপক্ষ মাইজকান্দির ওই নির্দিষ্ট স্থানে পৌর ভবন নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেননি।
একাধিক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও পৌর প্রশাসনের কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, পৌর ভবন নির্মাণ না হওয়ায় সমস্যা ধীরে ধীরে মারাত্মক আকার ধারণ করছে। দিন দিন পৌরসভার কাজ ও পরিসর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে একটি ঘরে কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। কক্ষ সংকটের পাশাপাশি জরুরী কাগজপত্র ও আসবাবপত্র রাখা যাচ্ছে না। ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভায় যে জনবল থাকার কথা তা নেই জকিগঞ্জে। বাড়তি জনবলের জন্যও বাড়তি জায়গা প্রয়োজন। পৌরসভার দুটি রোলার, একটি ট্রাক রাখার কোনো জায়গা না থাকায় খোলা আকাশের নিচেই এগুলি রাখতে হয়। এছাড়া মেয়র, কাউন্সিলর ও পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসার জন্য সুব্যবস্থা নেই।
পৌরসভার ভিত্তি প্রস্তর দেখতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো স্থানটিজুড়ে মৌসুমে ধানের চারা লাগানো হয়। খেতের একপাশে আইলের মাঝে ভিত্তি প্রস্তুরটি রয়েছে। বৃষ্টি আর রোদের কারণে সামাদ আজাদের নাম ফলকের লেখাগুলি মুছে গেছে। নির্বাচন সামনে এলে সকল প্রার্থীই ভবন নির্মাণের বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান। ভোট কমে যাবার আশঙ্কায়। পৌর এলাকার পূর্বাঞ্চলে পৌরভবন হলে পরবর্তীতে পশ্চিমাঞ্চলের ভোট পাওয়া যাবে না এই ভয়ে বিষয়টি নিয়ে নির্বাচনের আগে বা পরে তেমন কেউ মাথা ঘামান না। জকিগঞ্জ ছোট এলাকা পৌরবাসীর স্বপ্ন একটি নিজস্ব পৌরভবন। সেটি পূর্ব, মধ্য কিংবা পশ্চিম যে এলাকাতেই হোক। কিন্তু এমন মেয়র কী জকিগঞ্জবাসী পাবেন যিনি সাহস করে এগিয়ে আসবেন জকিগঞ্জ পৌরবাসীর এ স্বপ্ন পূরণে ? সেই প্রশ্নই পৌরবাসীর।
পৌর ভবন না থাকায় এত সমস্যা, অথচ পৌর ভবন নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেই কেন-এ প্রশ্নের জবাবে পৌরসভা বাস্তবায়ন কমিটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক বলেন,অনেক আশা নিয়ে আমরা জকিগঞ্জ পৌরসভা গঠনের উদ্যোগ নেই।এক পর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো সকলের পছন্দনীয় মুক্ত ও সড়ক সংলগ্ন এলাকায় ১ বিঘা জমি বিনামূল্যে সাফ কাবালা করে দিলে জকিগঞ্জ পৌরসভা হবে। মাইজকান্দির প্রয়াত আব্দুল মন্নান স্থানীয় সরকারের চাহিদা মতো অতি মুল্যবান একবিঘা জমি বিনামূল্যে দান করেন। তখন এ জমি দান না করলে জকিগঞ্জ পৌরসভা হতো না। জমিদানের পরে প্রায় ১০ বছর আব্দুল মন্নান বেঁচে ছিলেন তাঁর জীবদ্দশায় সে জমিতে পৌর ভবন নির্মিত না হওয়ায় তিনি হতাশা নিয়েই মারা গেছেন। এতে তারঁ পরিবার ও এলাকাবাসী দু:খিত। পৌরসভা বাস্তবায়ন কমিটির সহসভাপতি কাওছার রশিদ বাহার বলেন, ক্ষুদ্র রাজনৈতিক বিবেচনায় ভবনটি হচ্ছে না। জনগণের বৃহত্তর স্বার্থেই দানকৃত জায়গার পাশে বাকী প্রয়োজনীয় জমি কিনে পৌরভবন করা উচিত।
সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার বলেন, সিলেটে আমি নতুন। সব বিষয় এখনো জানার সুযোগ হয়নি। কেন নির্দিষ্ট জায়গায় পৌর ভবন হচ্ছে না তার খোঁজখবর নেব।

     এ জাতীয় আরো খবর