,

রশিদ হেলালী : প্রিয়মুখ, প্রিয়জন — মুনশি আলিম

১.
সেদিন অন্যান্য দিনের মতোই ছিলাম প্রাণচঞ্চল। কবিব্যাগ কাঁধে নিয়ে পাবলিক লাইব্রেরিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলাম। কিছুদূর যেতেই হঠাৎ বৃষ্টির মতই এক শুভাকাক্সিক্ষর মুখে শুনলাম একটি দুঃসংবাদ“রশিদ হেলালী স্যার আর নেই”। আমার বিশ্বাস হলো না। সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকি। সে আমাকে দিব্যি দিয়ে বলেÑ“অপ্রত্যাশিত হলেও ঘটনাটি সত্য”। মুহূর্তেই আমার চোখ ছলছল করে ওঠে। মনের ভেতরটাতে মোচড় দিয়ে ওঠে। অনুভূতির গহীন অরণ্যে হুহু করে বাতাস বইতে শুরু করে। আমি দূর আকাশের দিকে তাকাই। আকাশের গায়ে খ-িত নির্বাক কালোমেঘ। আজ এই অপ্রত্যাশিত সংবাদে তাদেরও বুঝি মন খারাপ!

আমার মনে পড়তে লাগলোÑএই তো সেদিন তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করেছিলাম। তিনিও মাথা ছুঁয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন। আমি মাথায় হাত দিই। মনে হলো তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট হাতের স্বর্গীয় স্পর্শ যেন এখনো আমার মাথা ছুঁয়ে আছে। মনে পড়ল আমাকে দেওয়া তাঁর শেষ ডায়লগওÑ“বেশ খরি পড়বায়, মানুষের মতো মানুষ অইবায়”। শ্রদ্ধেয় হেলালী স্যার, মানুষের মতো মানুষ হতে পেরেছি কিনা জানি না, তবে বেশি বেশি করে এখনো বই পড়ি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানের ভাষায় বলেছিলেন, “মনে রবে কিনা আমাওে …” এই পৃথিবীর মানুষ তাঁকে মনে রাখবে কিনা-গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ যেমন গানের বাণীতে প্রশ্নটি করেছিলেন তেমনই প্রশ্নটি সকল মানুষের। আর এই প্রশ্ন আছে বলেই আজন্ম মানুষ স্মৃতি সৃষ্টিতে মারিয়া হয়ে ওঠে। যেকোন সৃষ্টিশীল কর্মে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালায়। মূলত মনের ভেতরের সেই স্বপ্ন থেকেই সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল কর্মের এত তাড়া কিংবা এত প্রেরণা আসে। মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে নানা কর্মে। তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে স্মৃতি রক্ষার এক চিলতে চারণক্ষেত্র।
২.
শ্রদ্ধেয় রশিদ হেলালী স্যার বৃহত্তর জৈন্তাপুর উপজেলায় শিক্ষাপ্রসারের ক্ষেত্রে এক আলোকিত নাম। সমাজকে সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে, যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে হলে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন। সেই কারণেই তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে আত্মনিয়োগ করলেন। নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি দিয়ে, ব্যক্তিগত টাকা-পয়সা, মানসিক শ্রম, শাররীক শ্রমের মাধ্যমে দেখতে দেখতেই বেশ কয়েকটি স্কুল এবং কলেজ প্রতিষ্ঠা করে ফেললেন। নিজের দূরদর্শিতা ও কৌশলী বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে এমপিওভুক্তও করে ফেললেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব একটা বেশি না থাকলেও নিজের সে অপূর্ণতা তিনি ভুলে গেছেন অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে, বৃহত্তর জৈন্তা-গোয়াইনঘাটের অসংখ্য ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার আলো বিতরণের মাধ্যমে। শিক্ষার আলো বিতরণকে তিনি শুধু নিজের দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং মিশন হিসেবে নিয়ে ছিলেন। প্রতিটি কাজই তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে করতেন। আর এই কারণেই বুঝি তিনি সফল হতেন। আজকের যুগের আধুনিক ছেলেমেয়েদের কাছে তাঁর সৃষ্টকর্ম ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা নিঃসন্দেহে প্রেরণা হয়ে থাকার মতো।

রশিদ হেলালী যেনো এক জীবন্ত স্মৃতি। স্মৃতি মানুষের জীবনের এক আশ্চর্য বাস্তবতা। প্রত্যেক মানুষেরই স্মৃতিরপাতায় জমে থাকে অনেক না বলা কথা। অনেক ভালোলাগা, অনেক কষ্ট-দুঃখ-যন্ত্রণা সবসময়ই স্থান করে নেয় প্রতিটি মানুষের স্মৃতিরপাতা। সবারই রয়েছে জীবনভর নানারকম স্মৃতি। জীবনের যে কোনো বয়সে এসে স্মৃতিরপাতা হাতড়ে বের করা যায় এমন অনেক মুহুর্ত; যা একমূহুর্তের জন্য মুখে একচিলতে হাসির কারণ হয়ে যায়। আবার এমন অনেক মূহুর্ত স্মৃতিরপাতায় বন্দি হয়ে রয় যেগুলো নিমিষেই হাসিখুশি মনটাকে করে দিতে পারে বর্ষার মেঘের মতোই মলিন।
প্রত্যেকের স্মৃতিগুলোই যেন বৈচিত্র্যময়। একজনের জীবন কীভাবে কেটেছে তা হয়তো আরেকজন দেখতে পারে, তার জীবনী লিখতে পারে, কিন্তু কারো স্মৃতিরপাতা কেউ লিখতে পারে না। স্মৃতিরপাতা যেন প্রতিটি মানুষের পরম আপন। মানুষ নিজে চাইলেও যেন তার স্মৃতির পাতাকে হুবহু ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। প্রকৃতি তাকে সেই শক্তি দেয়নি। সে কেবল তার স্মৃতিরপাতা সম্পর্কে অন্যকে কিছুটা ধারণা দিতে পারে মাত্র।
প্রকৃত মানুষ জ্ঞান বিস্তারে আজীবন ব্রতী থাকেন। জীবন সম্পর্কে জ্ঞান লাভে এভাবে মানুষ বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশে মারিয়া হয়ে ওঠে। সেই তাড়না থেকে জন্ম হয় নব জাতকের। সৃষ্টি হয় সৃজনশীল কর্মের। এ রকমই একজন সৃষ্টিশীল মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ২০০১ সালে। তাঁর নাম রশিদ হেলালী। বাবার নাম তৈয়ব আলী। জৈন্তাপুর নিজপাট ইউনিয়নে তৈয়ব আলী ডিগ্রি কলেজ সংলগ্নই তাঁর বাড়ি। পোশাকে-আশাকে ছিলেন বেশ রুচিশীল একজন মানুষ। একাধারে তিনি ছিলেন মিষ্টিভাষী সুবক্তা, রাজনীতিবিদ, দক্ষ সংগঠক, সমাজ সংস্কারক, দানবীর, শিক্ষানুরাগী, সংস্কৃতিমনা বিজ্ঞ একজন ব্যক্তিত্ব। অবশ্য জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হওয়ার কিছুটা আগেই তাঁর বহুমুখী গুণ সম্পর্কে সম্যক জেনে ছিলাম।
৩.
নিষ্ঠুর এ মহাকাল সবাইকে মনে রাখে না। কেবল মানবকল্যাণে যাঁরা ব্রতী থাকে কেবল তাঁদেরকেই মনে রাখে। মনীষীরা চলে যান কিন্তু ধরণিতে রেখ যান তাঁদের মহান সৃষ্টকর্ম। যা কালজয়ী স্মৃতি হিসেবে টিকে থাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী। প্রতিটা মানুষের স্মৃতিরপাতা যদি কাগজে লিখে বিক্রি করা যেত, তাহলে তার প্রত্যেকটিই হতো একেকটি বেস্টসেলার নভেল! আলাদা আলাদা ধরনের প্রতিটি নভেলই তখন কারো না কারো মন ছুঁয়ে যাবে। ট্রাফিকে ফুল বিক্রি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে রোড ডিভাইডারেই শুয়ে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটির যেমন রয়েছে বিচিত্র স্মৃতি-বিজড়িত পাতা, ঠিক তেমনই চার চাকার মোটরযানে চড়ে যাওয়া টাই-সুট পড়া চোখের সামনে ডেইলি স্টার ধরে রাখা ভদ্রলোকেরও রয়েছে আরেক ধরনের কিছু স্মৃতি। এদের কারোটাই কারো থেকে কম বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়।

স্মৃতি প্রতিটি মানুষেরই একান্ত সঙ্গীর মতো থাকে। যখন আশেপাশে বন্ধুসুলভ কোনো মানুষ থাকে না, যখন একাকিত্বের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করতে হয়, ঠিক তখনই মানুষ আনমনেই যেন স্মৃতিরপাতা হাতড়ে চলে। সেই স্মৃতিরপাতায় রয়েছে নানা সুখ-দুঃখ। সেই স্মৃতিরপাতা যেন একবার চোখ-মুখ করে তোলে স্বপ্নীল, পরমূহুর্তেই করে ফেলে মলিন।
এই পৃথিবীতে কোন কোন মানুষ ক্ষণকাল পরে চিরতরে হারিয়ে যায়। যাকে বলা হয় অকালমৃত্যু । আবার কেউ কেউ এই স্বল্প সময়ে নিজেকে প্রকাশ করেন নানা সৃষ্টিশীল কর্মে। তাঁদেরকে মানুষ মনে রাখে বহুকাল, অনন্তকাল। রশিদ হেলালী ছিলেন তাঁদেরই একজন। তিনি স্বল্প পরিসরে নিজেকে জড়িয়ে ছিলেন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক কর্মকা-ে। শিক্ষাপ্রসারে ও জনকল্যাণমূলক কাজে তাঁর ছিল প্রচ- ঝুঁক। এসব কারণেই এলাকার মানুষের কাছে তাঁর স্মৃতি অম্লান হয়ে আছে। সৃজনশীল এই মানুষের আকস্মিক মৃত্যু আমাকে বড়োই ব্যথিত করেছিল।
মহাকাল চিরায়ত। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই চলছে এই বিশ্বসংসার। মানবজীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। মানবজীবন মহাসমুদ্রের ¯্রােতধারার মতো গতিশীল। এই ¯্রােত মহাকালের আবর্তনে প্রতিনিয়ত আবর্তিত হচ্ছে। কালের খাতায় ইতিহাসের পাতায় ফুটে ওঠেছে তার স্বরূপ, আগমন ও তিরোধানের ছবি। মানবজীবনে সৎকর্মের পরিধি ও ব্যপ্তি খুবই বিস্তৃত। পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবদের নিয়েই মানবজীবন ফুলে ফুলে সুশোভিত হয়ে ওঠে। মানবজীবন আপনা-আপনি রচিত হয় না। মানবজীবনকে রচনা করতে হলে ত্যাগ, সাধনা আর সংগ্রামের প্রয়োজন হয়। যাঁরা জীবনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাধনার দ্বারা জীবনসমদ্র রচনা করেছেন তাঁরাই ইতিহাসের শীর্ষে আরোহণ করে চিরস্মরণীয় হয়ে টিকে রয়েছেন। রশিদ হেলালী সেই সব অদম্য সাধনার মাধ্যমেই কালিক ইতিহাসে স্মরণীয় হওয়ার মতো।

লেখক : শিক্ষক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

     এ জাতীয় আরো খবর