,

শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ:সময়ের দাবী—প্রভাষক জ্যোতিষ মজুমদার

মানুষের মধ্যে যে সমস্ত মানবিক গুণাবলী রয়েছে, শিক্ষা সেগুলোকে বিকশিত করে। শিক্ষা মানব জীবনকে পরিশীলিত করে। তাই শিক্ষা জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান ধারক ও বাহক। আর এজন্যই শিক্ষাকে জাতির মেরুদ- হিসেবে আখ্যাতিয় করা হয়। শিক্ষা কথাটি বললেই প্রথমে যে কথাটি আসে তা হল শিক্ষক। কেননা যেকোন শিক্ষা ব্যব¯’ার প্রাণকেন্দ্র হ”েছ শিক্ষক। শিক্ষা ব্যব¯’ার গুণগত উৎকর্ষ নির্ভর করে শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা, নিষ্ঠা ও প্রচেষ্টার উপর। এই চরম সত্যটি পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। নিষ্ঠাবান ও মেধাবী শিক্ষকেরাই মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের সংকট উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। শিক্ষকদের গঠনমূলক দায়িত্বশীল ভূমিকা জাতিকে উন্নতির স্বর্ণশিখরে পৌছে দিতে পারে।
শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। শিক্ষকতাকে নিছক কোন চাকুরী মনে করা হলে ভুল করা হবে। বহির্বিশে^ নিজদেশের গৌরবময় অব¯’ান তুলে ধরতে একজন আদর্শ শিক্ষকের অবদান কোন রাষ্ট্রনায়ক, অর্থনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ বা কোন সমাজ নেতার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, একজন আদর্শ শিক্ষক দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান ও শ্রেষ্ঠ মানুষদের অন্যতম।
জাতির বুনিয়াদ গঠনে এবং দেশের যশ, খ্যাতি, সমৃদ্ধি, সম্প্রসারণ তথা জাতীয় আদর্শ ঐতিহ্যের ধারা সংরক্ষণে শিক্ষকের ভূমিকা অন্য যেকোন পেশাগত কর্মীর চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। একথা অনস্বীকার্য যে, জাতি গঠনে শিক্ষকের অবদান সবচেয়ে বেশি। কারণ অন্যান্য পেশার পেশাজীবীদের শিক্ষার প্রারম্ভিক হাতে খড়ি শিক্ষকদের কাছে। ভবিষ্যতের রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, কবি-সাহিত্যিক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ সবার প্রথম শিক্ষার প্রদীপটি প্রজ্জ্বলিত হয় শিক্ষদের হাতেই। সুক্ষ্মভাবে বিচার করলে বলা যায় শিক্ষক হলেন ভবিষ্যতের দেশ ও সমাজ গঠনের কর্ণধার।
শিক্ষক হ”েছন শিক্ষা ব্যব¯’ার কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষার সামগ্রীক পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপদান করেন শিক্ষক। শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিহার্য। এজন্য শিক্ষককে শিক্ষা ব্যব¯’ার প্রাণ বলা হয়। শিক্ষকগণ মানব সন্তানকে মানবিক গুণাবলী দিয়ে সত্যিকার মানবে পরিণত করেন বলেই তাঁদেরকে বলা হয় দ্বিতীয় জন্মদাতা। ব্রতচারী মনোভাব নিয়ে শিক্ষকগণ নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞান দান ও শিক্ষিত করে গড়ে তোলেন বলেই শিক্ষকগণকে মানুষ গড়ার কারিগর নামে অভিহিত করা হয়। কিন্তু এই কারিগরদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদার কথা বলতে গেলে বলতে হয় এ বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত। একটি স্বাধীন দেশের জন্য আমাদের শিক্ষকতার অবস্থা অত্যন্ত লজ্জাজনক। শিক্ষকতাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে একটি উপযুক্ত মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও অতি দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, অবহেলা ও অবজ্ঞার ফলেই শিক্ষকতা পেশা কোন মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হ”েছ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রায় ৯০% শিক্ষার্থীর প্রয়োজন মিটা্ছ বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। তা সত্ত্বেও সে অনুপাতে শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার কোন ক্ষেত্রেই তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা এখনও নিশ্চিত করা হ”েছ না।
“রাজনীতির বাইরেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষা ও শিক্ষা সম্পর্কিত বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে তাঁর সরকারের আমলেই এ বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি জানতেন, দেশের শিক্ষক সমাজকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া না হলে দেশ ও জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। এ জন্য তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সরকারি কর্মচারির মর্যাদা দেন। স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে এক যুগে জাতীয়করণ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয় করণের ঘোষণা দেন। প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাসে যা একটি মাইল ফলক ঘটনা।
প্রতিযোগিতাময় বিশ^ায়নের এ যুগে ক্ষুধার্থ শিক্ষক দিয়ে তৃষ্ণার্থ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটানো কোন ভাবেই সম্ভব নয়। এটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উপলব্ধি করতে হবে। বেসরকারী শিক্ষকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদনের উপর জাতির কৃষ্টি, সভ্যতা ও সমৃদ্ধি নির্ভর করে। কিš‘ শিক্ষার সেই প্রাণ বেসরকারী শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবসময়ই সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার। কিš‘ কেন? আমরা কি একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ আশা করতে পারি না?
শিক্ষকতা সমাজ ও রাষ্ট্রের সবচেয়ে উ”চ মর্যাদা সম্পন্ন পদ। একজন মানুষের জীবনে তার পিতা-মাতার পরই সর্বো”চ আসনে শিক্ষকদের স্থান। দেশের সর্বো”চ পদে অধিষ্ঠিত মহামান্য রাষ্ট্রপতিও যদি তাঁর শিক্ষককে সামনে দেখেন, তখন শ্রদ্ধায় মাথা নত করেন। আর সেই শিক্ষকরাই আজ সমাজে বঞ্চিত, নির্যাতিত, নিষ্পোষিত ও অবহেলিত।
বাংলাদেশকে বিশ^মানে উত্তীর্ণ করার জন্য সরকার এবং বিরোদী দল বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বক্তব্য প্রদান করেন। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার মডেল হিসেবে দাড় করাণের প্রতিশ্রুতিও অনেকে দিয়ে থাকেন। বিগত ২০১০ সালের ১২ মে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এবং ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা দিয়েছিলেন তাঁর দল (বিএনপি) ক্ষমতায় গেলে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকুরী জাতীয়করণ করবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন দাবী আদায়ে শিক্ষকদের রাস্তায় নামতে হবে না।
দিন বদলের সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল কলাকৌশলীদের প্রতি সবিনয় অনুরোধ বেসরকারি শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানে জাতীয়করণের ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করুন, তবেই কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
লেখক– প্রভাষক, ইছামতি ডিগ্রি কলেজ। সাধারন সম্পাদক- বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম, সিলেট জেলা শাখা। মোবাইল : ০১৭২৪ ২৭৫৩৯১

     এ জাতীয় আরো খবর