,

সড়কের গর্তের চেয়ে জকিগঞ্জবাসীর মনের ক্ষত বেশী

আল মামুন, জকিগঞ্জ::
রবিবার সকাল নয়টায় সিলেট থেকে ছেড়ে আসা বিরতিহীন একটি যাত্রীবাহী বাস সিলেট-জকিগঞ্জ রোডের মৌলভীছাইর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে আসা মাত্র গর্তে আটকে যায় গাড়ীর চাকা। চালক এক পর্যায়ে যাত্রীদের বাস থেকে নেমে যেতে অনুরোধ করেন। উপায়ান্তর না দেখে বাধ্য হয়ে যাত্রীরা গাড়ী ছেড়ে যে যার মতো করে গন্তব্যে রওয়ানা হন। এভাবে প্রতিদিনই ঝুঁিক নিয়ে গাড়ী চলে জকিগঞ্জ-সিলেট সড়কে। সিলেট শহর থেকে জেলার সবচেয়ে দূরবর্তী উপজেলা জকিগঞ্জ। জেলা শহর থেকে জকিগঞ্জের দূরত্ব ৯১ কি.মি.। সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কটি প্রায় চার বছর ধরে বিধ্বস্ত হয়ে আছে। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে সড়কটি। যানবাহন চলে ঝুঁকি নিয়ে। গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগছে বেশি, বেড়েছে যাত্রী ও চালকদের কষ্ট। ক্ষতি হচ্ছে পরিবহনেরও। ঘটছে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা। কবে এ সড়কে কাজ শুরু হবে তার ঠিক করে কেউ বলতে পারছেন না। আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগে সড়কে সৃষ্ট শত শত গর্ত ভরাট না করা হলে এ সড়কটি নড়কে পরিণত হবার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। সড়কের গর্তের চেয়ে জকিগঞ্জবাসীর মনের ক্ষত অনেক বেশী।
সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ এ চার উপজেলার মানুষ যাতায়াত করেন। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের পুরো অংশ জুড়েই কমবেশি ভাঙ্গা রয়েছে। পিচ ওঠে খানাখন্দ তৈরী হয়েছে খানে খানে। বৃষ্টিতে কাদা হয়, রোদে ধুলা উড়ে। বিশেষ করে শাহবাগ থেকে আটগ্রাম-কালীগঞ্জ-জকিগঞ্জ বাজার পর্যন্ত রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর এ সড়কে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুই কন্যা শিশুসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন।
এ সড়কের বিবর্ণ দশা দেখে বুঝার উপায় নেই যে জকিগঞ্জবাসীর বড় এ সমস্যাটি দেখার মতো কোনো অভিভাবক আছেন। এ সড়ক সংস্কারের দাবীতে সিলেট সড়ক পরিবহন সমিতি গত বছর ১৩দিন পরিবহন পরিবহন ধর্মঘট পালন করা হয়। জেলা সমন্বয় সভায় এ বিধ্বস্ত সড়ক নিয়ে একাধিকবার আলোচনা সভায় আলোচনা হয়েছে। জকিগঞ্জ উন্নয়ন সমিতি সিলেট এ সড়কটি সংস্কারের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছে।। নানা কর্মসূচি পালন করেছে জকিগঞ্জ যাত্রী কল্যাণ পরিষদ, জকিগঞ্জ-কানাইঘাট উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদ। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না । সড়ক ও জনপথ বিভাগের আশ্বাসেই সন্তোষ্ট থাকতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।
এ সড়কে নিয়মিত যাতাযাতকারী ইছামতি ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মুন্সি আব্দুল আলিম বলেন, এ বটরতল এলকায় বিশেষ করে মৌলভীছাইর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। শাহবাগের ফিশারী সংলগ্ন এলাকার আশপাশের প্রায় দুই কিলোমিটার, সড়কের বাজার থেকে কালীগঞ্জ বাজার সেখান থেকে ইউনিয়ন অফিস পর্যন্ত রাস্তা মারাতœক বিধ্বস্ত। দোয়া দুরুদ পড়েই গাড়ীতে চলতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে পত্র পত্রিকা ও ফেসবুকে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। উপজেলা আওয়ামীলীগ নেতা জয়নাল আবেদীন বলেন, আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। আমরা আন্দোলনের প্রস্ততি নিচ্ছি।

বাস চালক বদরুল আলম বলেন- ‘মনে হয় এই বুঝি গাড়ি উল্টাইয়া গেল। ঝুকিঁ নিয়াই গাড়ি চালাই। এ সড়কে গাড়ি চালাইতে সময়, তেল ও যন্ত্রপাতি নষ্ট এবং যাত্রীদের কষ্ট হয়’।
বাসযাত্রী শিক্ষক মোহাম্মদ আলী বলেন-নি¤œমানের নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহারের কারণেই রাস্তাটি ঘনঘন নষ্ট হয়। দ্রুত রাস্তা নষ্ট হলে ইঞ্জিনিয়ার, কর্মকর্তা ,কর্মচারী ও ঠিকাদার আবার কাজ পান।
জকিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার পরে কখনো গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি এভাবে বিধ্বস্ত হয়নি। সঠিক নেতৃত্ব ও যোগ্য প্রতিনিধিত্ব না থাকায় আমরা আরো কত কষ্ট করবো তা আল্লাহই ভালো জানেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব সেলিম উদ্দিন ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আহমদ আল কবির ১৭ মার্চ কালীগঞ্জে প্রবাসীদের একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন ২৪ মার্চ থেকে সংস্কার কাজ শুরু হবে। তাদের আশ্বাস ভেস্তে গেছে। এপ্রিলের ২৪ তারিখও কাজ শুরু হয়নি। কবে হবে তা কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। ৩০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেট-জকিগঞ্জ-চারখাই সড়ককে মহাসড়কে উন্নীত করার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। প্রস্তাবিত মহাসড়ক এখন মহা বিড়ম্বনার নাম।
দর্ভোগের সড়কে পরিণত হয়েছে সিলেট-জকিগঞ্জ। এ সড়ক সিলেট জেলার ৪টি উপজেলা ও ১৪টি বাজারের মধ্যে দিয়ে গেছে। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে হাজার হাজার লোক উপজেলা থেকে জেলা শহর, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন কাজে যাতায়াত করে। এছাড়া ভারতের সঙ্গে জকিগঞ্জের কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনে দু’দেশের যাতায়াতকারীরা এ সড়ক ব্যবহার করে। কিন্তু বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি বেহাল অবস্থায় রয়েছে।
সড়কের বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে পানি জমে আছে। এতে স্থানীয় লোকজনসহ ভারত থেকে ভ্রমণে আসা লোকজন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিজন কুমার সিংহের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন সিলেটে অনুষ্ঠিত বিগত ৩টি সভায় সড়ক সংস্কার বিষয়টি উপস্থাপন করেছি। জেলা প্রশাসক সিএন্ডবির কর্মকর্তাদের বকাঝকাও করেছেন। আবারও বিষয়টি নিয়ে জোরালো কথা বলবো।
সিলেট সিএন্ডবির এসডিই নূরুল মজিদ চৌধুরী বলেন আগামী শুক্র বা শনিবার বটরতল এবং কালিগঞ্জ এলাকায় কাজ শুরু করবে বলে ঠিকাদাররা তাকে নিশ্চিত করেছেন।

     এ জাতীয় আরো খবর