,

জকিগঞ্জের দুই জয়িতার কথা

জকিগঞ্জ ::
‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’ সফল কোনো নারীর ক্ষেত্রে বাক্যটি প্রযোজ্য হয়। স্বামী, সংসার সামলানোর পর কোনো নারী যখন চোখে পরার মতো সামাজিক কাজে সম্পৃক্ত হন তখনই মিলে স্বীকৃতি। সামাজিকতা,আন্তরিকতা ও মানবিকতার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করে পরিবার প্রতিপালনের পাশাপাশি জনসেবার উপহার হিসেবে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে বিগত দিনে সমাজ সেবার কাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন । তারই স্বীকৃতি পেয়েছেন এবার। নির্বাচিত হয়েছেন উপজেলার সেরা জয়িতা। বলছিলাম জকিগঞ্জ উপজেলার ১ নং বারহাল ইউনিয়নের সাবেক সদস্য বাটইশাল গ্রামের মৃত রকিব আলীর মেয়ে রহিমা বেগমের কথা। পঞ্চাশোর্ধ এ নারী দীর্ঘদিন ধরে নিরবে সরবে কাজ করছেন সমাজ উন্নয়নে।
দারিদ্র পীড়িত মানুষের সেবা তার অন্যতম ব্রত । দরিদ্র পরিবারে চিকিৎসা বাবদ আর্থিক সহায়তা, কন্যা দায়গ্রস্থ পরিবারে বিবাহকালীন আর্থিক সহায়তা,মৃত্যুকালীন কাফন দাফন করার কাজে আর্থিক সহায়তা,পুরুষবিহীন পরিবারে মহিলা ও শিশুর চিকিৎসায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, বিভিন্ন দপ্তর ও এনজিওর সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে দরিদ্রকে সহায়তা প্রাপ্তিতে সাহায্য করা, টিউবওয়েল স্থাপন, শিশুদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ,কৃষকদের সার ও বীজ প্রদানসহ যেখানেই সম্ভব সেখানেই বাড়িয়ে দেন বন্ধুর হাত। সমাজসেবামূলক কাজের কারণে এলাকার মানুষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে মহিলা সদস্য নির্বাচত করে তাকে। যার ফলে জনসেবা করার পথ সুগম হয়। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে রাস্তা-ঘাট নির্মাণ,বয়স্ক ভাতা,বিধবা ভাতা,মাতৃত্বকাল ভাতা,ভিজিডি চাল ইত্যাদি সততা ও নিষ্ঠার সাথে বন্টন করে সুনাম কুঁড়িয়েছেন এলাকায়। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য না হয়েও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সকল সদস্যর অনুরোধে ইউ/পি স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবী সমাজকর্মী হিসাবে কাজ করছেন। রহিমা বেগম বলেন, মানুষের জন্য কাজ করার আনন্দই আলাদা। সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে আরও বেশি করে সমাজ উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।
জয়িতা হাসনা বেগমের জীবনের গল্পটাও অনুকরণীয়। ‘বিশ্বে যা কিছু মহান চিরকল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। জাতীয় কবির এ বাণী তাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। ২০০১ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার পর স্বামীর স্বল্প আয়ের সংসারে তিনি কিছু উপার্জনের চিন্তা করেন। বেকারত্বের অভিশাপ মুছে ফেলার এলোমেলো ভাবনা তাড়িত করে তাকে। কর্মের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয়ে সর্বদা অটুট ছিলেন হাসনা বেগম। স্বপ্নের ডালাপালাগুলো স্বামীর সাথে ভাগাভাগি করার পর এগিয়ে আসেন তিনি সাগ্রহে। সর্ব প্রথম নকশী কাঁথা, ওয়ালম্যাট ও অন্যান্য হাতের তৈরী পণ্য বাজারে বিক্রি করে আয়ের উৎস্য তৈরী করি। দিনের বেলায় একটি স্কুলে মাসিক তিন হাজার টাকা বেতনে ৩ বছর চাকুরী করেন জকিগঞ্জ পৌরসভার আলমনগর গ্রামের আব্দুল মান্নানের স্ত্রী হাসনা বেগম। স্কুল ছুটিকালীন সময়ে একটি বিউটি পার্লারে ১০ দিনের প্রশিক্ষণ নেন। শুরু হয় জীবনের আর একটি অধ্যায়। শুরু করেন নিজ ঘরে পার্লারের কাজ। এ কাজে এক বছরের মধ্যে পরিচিতি লাভ করেন এবং একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চিন্তা করেন। যেই ভাবনা সেই কাজ। স্থানীয় ইখওয়ান সেন্টারে ১ টি কক্ষ ভাড়া নিয়ে ‘টিউলিপ বিউটি পার্লার’ চালু করেন। ব্যবসা ভালো হওয়ায় কিছুদিন পর আর একটি রুম সংযুক্ত করে কসমেটিক্্রসহ সেলাই কাজ শুরু করেন ২০১৬ সালে সিলেটের কদমতলীতে আরও একটি পার্লার প্রতিষ্ঠা করেন আতœ প্রত্যয়ী এই নারী। বর্তমানে দুটি প্রতিষ্ঠানে ১৫ জন কর্মচারী নিয়োজিত আছে। বর্তমানে ব্রাক ব্যাংকের আওতাধীন বিউটিশিয়ান ট্রেইনার হিসাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। এছাড়া আরো ৩০-৩৫ জন নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে আতœকর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন তার কাছে। বর্তমানে হাসনা বেগম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। একজন সৌখিন সঙ্গীত শিল্পীও তিনি। সীমান্ত উপজেলা জকিগঞ্জে পিছিয়ে থাকা নারী সমাজের জন্য সফল উদ্যোক্তা হাসনা বেগম একটি দৃষ্টান্ত। শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রাখায় তিনি এবার উপজেলার সেরা জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। জয়তু জয়িতা রহিমা জয়তু জয়িতা হাসনা।

     এ জাতীয় আরো খবর