,

জকিগঞ্জে টক মিষ্টির মাল্টায় পাল্টে গেছে ভাগ্য

আল মামুন,জকিগঞ্জ,সিলেট:
বাড়ির পাশের জায়গাটি মূল্যবান হলেও সেখানে কাঙ্খিত ফসল ফলানো হয়ে উঠে না কোনো কৃষকেরই। অনেকটা অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকে সেটি। এমনই প্রায় পরিত্যক্ত একটি জমিতে বিদেশী ফল মাল্টার বাণিজ্যিক চাষ করে কৃষি বিভাগকে চমকে দিয়েছেন সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের হালঘাট গ্রামের কৃষক ইসমাইল হোসেন ও তার পরিবার।
ইসমাইল হোসেন জানান, জকিগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসের উপ সহকারী মাঠ কর্মকর্তা বলাই বিশ্বাস প্রথম তাকে মাল্টা চাষের পরামর্শ দেন। ২০১৬ সালের এপ্রিলে স্থানীয় কৃষি অফিসের সহযোগিতায় ৬০ শতক জায়গায় মাল্টা চাষ শুরু করেন তিনি। মাল্টা গাছের চারা, সার, কিটনাশক ও পরামর্শ সবই বিনামূল্যে দেয় কৃষি বিভাগ । মাত্র চার বছরের মাথায় আশাতীত ফলন পেয়ে যার পর নাই খুশী ইসমাইলের পরিবার। যে জমিতে সব মিলিয়ে বছরে ২০ হাজার টাকার ধান পাওয়া যেতো সেখান থেকে গত বছর প্রায় দেড় লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করেন। এবার তার মাল্টা বাগানে থেকে কমপক্ষে ৫ লক্ষ টাকার মাল্টা বিক্রি হবে। ইতিমধ্যে তিনি প্রায় ১২শ কেজি মাল্টা বিক্রি করে দেড় লক্ষ টাকা পেয়েছেন। এর মধ্যে সার,ঔষধ, রক্ষণাবেক্ষন ও শ্রমিক বাবদ খরচ হবে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এবার উৎপাদন খরচ বাদে আয় হবে সাড়ে চার লক্ষ টাকা। গত বছর পাইকারী বিক্রি করায় এলাকার মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে প্রচুর চাহিদা থাকায় এবার স্থানীয় ভোক্তাদের কাছে পর্যায়ক্রমে খুচরা বিক্রি করছেন। বিদেশী মাল্টার চেয়ে দামে সস্তা। বিদেশী মাল্টা প্রতি কেজি ১৯০/২০০টাকায় বিক্রি হলেও সবুজ দেশী মাল্টা বিক্রি করছেন ১৩০টাকা কেজিতে। যারা একবার নিচ্ছেন তারা আবারো যাচ্ছেন মাল্টা কিনতে। এলাকার মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে ইসমাঈলের মাল্টা চাষের সাফল্য ও স্বচ্ছলতার কথা। অক্টোবরে মাল্টা পাকা শুরু হয়। তাই এখন ইসমাইলের পরিবারে অন্য রকম প্রাপ্তির উজ্জ্বল্য।তাদের চোখে মুখে অফুরন্ত হাসি।
প্রতিদিন দৃষ্টিনন্দন মাল্টা বাগান দেখতে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন লোকজন। কৃষি বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জের কৃষকগণ দফায় দফায় পরিদর্শণ করেছেন এ প্রদর্শণী বাগানটি। খামার বাড়ি ফার্মগেট ঢাকা থেকে মাল্টা চাষের উপর যে পুস্তিকা প্রকাশ করেছে তার প্রচ্ছদে ব্যবহার করা হয়েছে জকিগঞ্জের ইসমাইলের মাল্টা বাগানের ছবি।
জকিগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা নাজমুল হোসেন জানান, সাইট্রাস ফসলের মধ্যে মাল্টা অন্যতম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০০৩ সালে ‘বারি মাল্টা-১’নামে মাল্টার যে উন্নত জাত উদ্ভাবন করে তা দেখতে সবুজ, খেতে সুস্বাদু ও রসালো। শুষ্ক মাঝারী উঁচু জমি যেখানে রোদ পরে সেটি মাল্টা চাষের জন্য উপযুক্ত। তিনি বলেন, একবার গাছ লাগালে ১৫-২০ বছর ফল ধরে।
‘সিলেট অঞ্চলে শষ্যের নিবিড়তা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প’র আওতায় জকিগঞ্জ উপজেলায় ৬০ শতক জমির ১২টি এবং রাজস্ব খাতের অর্থায়নে ৩০ শতকের ২০টি মাল্টা বাগান করা হয়েছিল। যথাযথ পরিচর্যার অভাবে তাদের সবাই সমান সাফল্য পাননি। ইসমাইল হোসেনের বাগানটি শুধু সিলেট বিভাগ নয় দেশের অন্যতম একটি মাল্টা বাগান। তাকে দেখে ব্যক্তি উদ্যোগে মাল্টা বাগান করেছেন একই ইউনিয়নের মজলী গ্রামের মঈন উদ্দিন, সুলতানপুর গ্রামের মুসলেহ আহমদ, বারঠাকুরি ইউনিয়নের আনন্দপুর গ্রামের নজরুল ইসলামসহ অনেকেই মাল্টা চাষে নেমেছেন।
ইসমাইলের বাবা আসাব আলী জানান, শুরুর দিকে জমিতে মাটি ভরাট ছাড়া তার নিজের খরচ হয়েছে মাত্র হাজার বিশেক টাকা। মাল্টা বাগানে ইসমাইলের সাথে পরিচর্যার কাজ করেন তার বাবা আসাব আলী, ভাই আলী হোসেন ও কাওছার আহমদ।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমী আক্তার বলেন, আমি একাধিকবার গিয়েছি সেখানে। উচ্চ ফলনশীল মাল্টা বাগানটি দেখে আমি অবিভূত। প্রতিটি গাছেই থোকা থোকা মাল্টা। ফসলের ভাড়ে নুয়ে গেছে ডালগুলো। গাছে গাছে ঝুলছে হজারো মাল্টা। টক মিষ্টি জাতের এ মাল্টা যারাই একবার মুখে নিয়েছেন তারাই প্রশংসা করেছেন এর। বিষমুক্ত পুষ্টিকর লাভজনক মাল্টা চাষের দৃষ্টান্ত ইসমাইল হোসেন। সিলেটের পতিত জমিকে চাষের আওতায় আনতে অন্যদের কাছে অনুকরণীয় হতে পারেন ইসমাইল।
উপজেলা চেয়ারম্যান মো. লোকমান উদ্দিন চৌধুরী বলেন, জকিগঞ্জের কৃষক ইসমাইল আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন জকিগঞ্জের মাটি মাল্টা চাষের উপযোগী । নতুন একটি সম্ভাবনা তিনি উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে। সঠিক পরামর্শ, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা, সদিচ্ছা,লেগে থাকা আর আন্তরিকতায় সফলতা সম্ভব ইসমাইলই তার দৃষ্টান্ত।

 

     এ জাতীয় আরো খবর