,

ফলন ভাল দাম বেশী জকিগঞ্জে সুপারির হাসি

আল মামুন, জকিগঞ্জ:
‘বাঁশ মাছ সুপারী জকিগঞ্জের বেটাগিরি’/‘মাছ সুপারি ধান জকিগঞ্জের প্রাণ’/“ইছামতির পুয়া (ছেলে) চাপ ঘাটের গুয়া (সুপারি) এসব প্রবাদই প্রমাণ করে জকিগঞ্জ সুপারির জন্য বিখ্যাত। সিলেটের সীমান্ত উপজেলা জকিগঞ্জে ধানের পরই যে ফসল অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলে তা সুপারী। সুপারি বছরে অন্তত একবার পশ্চাৎপদ এ জনপদের মানুষের চোখে মুখে এনে দেয় হাসির ঝিলিক। এখন জকিগঞ্জে সুপারির ভরা মৌসুম। স্থানীয় সবকটি বাজারে জমে উঠেছে মৌসুমী ফল সুপারির হাট। গতবারের চেয়ে এবার জকিগঞ্জে সুপারির ফলন ভালো দামও বেশি। গত বছর প্রতি ‘ভি’(৪৪০টি) সুপারি চারশ থেকে আটশ টাকা বিক্রি হলেও এবার মৌসুমের শুরুতেই তা বিক্রি হচ্ছে ছয়’শ থেকে বার’শ টাকা দরে। ফলে বাগান মালিক, খুচরা ও পাইকারী বিক্রেতারা খুশি।
নবান্নের উৎসবের মতোই অক্টোবর-নভেম্বর মাসে পুরো জকিগঞ্জে সুপারির উৎসব বসে। গাছ থেকে সুপারি পাড়া, চাতলে শুকানো, বিভিন্ন গ্রেডে ভাগ করা ও বাজারে নেয়ার কাজে নিয়োগ করা হয় শ্রমিক। জকিগঞ্জের প্রায় প্রতিটি পরিবারে এ সময়টা কাটে ব্যস্ততার মধ্যে। মানুষের চোখে-মুখে ফুটে উঠে অন্য রকম এক প্রাপ্তির উজ্জ্বল্য। উপজেলার প্রতিটি বাজারে প্রচুর সুপারি বিকিকিনি হয়। সপ্তাহে দু’দিন জকিগঞ্জ বাজার, বাবুর বাজার, শরীফগঞ্জ বাজার, কালিগঞ্জ বাজার, শাহগলী বাজারে সুপারীর বড় হাট বসে। এছাড়া উপজেলার প্রতিটি ছোটছোট বাজার থেকে ফরিয়ারা সুপারি ক্রয় করে বড় হাটে বিক্রয় করে থাকে। হাটবারে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখা যায় ফরিয়াদের সরব উপস্থিতি। পুরো উপজেলায় তিন শতাধিক ফরিয়ার হাত ঘুরেই বেশির ভাগ সুপারি আসে বিভিন্ন বাজারে।
জকিগঞ্জ থেকে সিলেটসহ পার্শ্ববর্তী জেলা সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ছাড়াও রংপুর, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, নীলফামারী, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ নানা জেলায় জকিগঞ্জের সুপারির চাহিদা রয়েছে । শুধু মাত্র জকিগঞ্জ বাজারেই হাটবারে ৬/৭ শত বস্তা সুপারি ক্রয়-বিক্রয় হয় বলে জানান পাইকারী বিক্রেতা সয়ফুল আলম । দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন ট্রাক বোঝাই হয়ে যাচ্ছে সুপারি। স্থানীয় বাজার থেকে সুপারি কিনে দেশের নানা প্রান্তে বিক্রি করছেন মাসুক আহমদ, কবির আহমদ, আবুল হোসেন, এমাদ উদ্দিন, আব্দুল কাদির, আলতাব আহমদ, বশির আহমদ, জমির আলী প্রমুখ। তারা জানান, সিলেটের কাজির বাজার ও রংপুরে জকিগঞ্জের সুুপারির প্রচুর কদর। এ বছর আড়তে সুপারি বিকিকিনি বেশি হওয়ায় গতবারের চেয়ে এবার দাম বেশি। সুপারী হাটের ইজারাদার রুহুল আমিন সায়েক জানান, মানের দিক থেকে জকিগঞ্জের সুপারি অন্য যেকোন জেলার চেয়ে ভাল, দামেও সস্তা। স্থানীয়ভাবে সুপারি মজুদ করায় এবং দেশের বিভিন্ন বাজারে চাহিদা থাকায় এবার সুপারির দাম ভাল।
স্থানীয় ভাষায় সুপারিকে গুয়া বলা হয়ে থাকে। এর হিসাব নিকাশটাও একটু ভিন্ন। ১১টি সুপারি একত্রে এক ঘা এবং ৪০ ঘা’ তে এক “ভি”। স্থানভেদে এর এর ভিন্নতাও আছে।
উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের হিসেবে গত বছর উপজেলার ২৭৮ একর ভূমিতে ৩ লক্ষাধিক সুপারি গাছে প্রায় ২০ হাজার কেজি সুপারি উৎপাদিত হয়েছে।
খলাছড়া গ্রামের আকই মিয়া বলেন-গত বছর ষাট হাজার টাকার সুপারি বিক্রি করলেও এবার লক্ষাধিক টাকার সুপারি বিক্রি করতে পারবো আশা করছি। জকিগঞ্জ বণিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জব্বার জবাই মিয়া বলেন, বিনা পুজিতে, বিনা পরিশ্রমে ঘরে বসেই এ মৌসুমে সুখী সিলেট সীমান্তের জকিগঞ্জবাসী। সুপারির সুবাদে কার্তিকের অভাব স্পর্শ করতে পারে না স্থানীয়দের।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিজয় কৃষ্ঞ হালদার বলেন, মৌসুমী ফল হিসাবে জকিগঞ্জে সুপারির জুড়ি নেই। সুরমা-কুশিয়ারা নদী বেষ্টিত সীমান্ত উপজেলা জকিগঞ্জের সুপারির সুনাম দেশ জুড়ে। জকিগঞ্জের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে সুপারির নিবিড় সম্পর্ক। উচ্চ ফলনশীল জাত নির্বাচন, সঠিক পরিচর্যা আর উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার হলে জকিগঞ্জে সুপারির ভবিষ্যৎ আরো উজ্জ্বল হবে।

     এ জাতীয় আরো খবর